চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার কারণে এ মৌলিক অধিকার মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষকে নিঃস্ব হতে হচ্ছে। অভাবের আগুনে পুড়ছে অনেক সুখের সংসার। চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনতে প্রথমত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কোনো দেশের উন্নয়নে নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও ব্রিজের পাশাপাশি জনগণের স্বাস্থ্য যদি ঠিক না থাকে তাহলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। তাই স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারকে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সরকার এ খাতে বরাদ্দ বাড়ালে মানুষের ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয় কমবে বলে আশা করা যায়। 

দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বরাদ্দের হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এবার মোট বাজেটের নিরিখে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এ খাতে বরাদ্দ অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। 

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি সেবার মান উন্নয়ন করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো মানুষ অসুস্থ হলে যাতে সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এতে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমে আসবে। 

এরপর মানুষকে সবচেয়ে বেশি খরচ করতে হয় ওষুধে। চিকিৎসকরা রোগীকে যেসব ওষুধ প্রেসক্রিপশন করেন সেসব ওষুধ রোগীকেই কিনতে হয়। তবে এসব ওষুধ যদি হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা যেতে পারে তাহলে চিকিৎসা ব্যয় কমে আসবে। অপারেশন বা ক্যানসারের ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়, এসব রোগ বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়। এগুলোকে যদি হাসপাতাল থেকে সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয় তাহলে মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় কমে আসবে। উন্নয়ন টেকসই হবে এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবায় উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, হাসপাতালগুলো গত এক বছরে রোগ নির্ণয়ে করা বিভিন্ন পরীক্ষার ফি বাড়িয়েছে (সরকার নির্ধারিতগুলো ছাড়া) কমপক্ষে ১৫ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৪০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। একই সময়ের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ ফি ও ওষুধের ব্যয় বেড়েছে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালে এ ব্যয় বেড়েছে ৫০-১০০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এ মুহূর্তে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য ব্যয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে ভালো করতে হলে বেসরকারি খাতের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি। ১৯৮২ সালে প্রণীত বেসরকারি হাসপাতাল অর্ডিনেন্সের আধুনিকায়ন করা দরকার। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়কে শক্তিশালী করতে হবে। তাদের ক্ষমতায়ন করে জেলা ও উপজেলার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে হবে। 

এদিকে সরকার যখন চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে, তখন সরকার চাইবে না অতিরিক্ত ওষুধ কিনুক বা অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুক। ফলে প্রেসক্রিপশন ছাড়া মেডিসিন বিক্রিও কমে আসবে। দেশে কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই যে কেউ ওষুধ কিনতে পারে, ওষুধের দামও বেশি। এসব কারণে ওষুধের খরচ বেশি হয়। যদি প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে অনেকাংশেই ওষুধের ব্যয় কমে আসবে। 

ওষুধের পর সবচেয়ে বেশি খরচ হয় প্যাথলজি পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। সরকার উদ্যোগ নিলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দেশের সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো হাসপাতালে কী পরিমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় তার হিসাব বা কোনো তদারকি নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার হিসাব যদি অনলাইনে তদারকি করার ব্যবস্থা থাকে তাহলে কোনো বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বেশি হচ্ছে কিনা তা বোঝা যাবে। কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজনীয় তাও সহজে বোঝা যাবে। এক্ষেত্রে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করার কারণেও রোগীদের ব্যয় বাড়ছে। তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অন্য রোগগুলোও ভালোভাবে ম্যানেজ করা যাবে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সূচকের মান বেড়ে যাবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় জনবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকলে হেলথ সার্ভিসের অন্যান্য সূচকও ভালো হবে। 

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণার তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের তুলনায় গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ২০২৩ সালে তিন গুণ বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাসিক ১ হাজার ৭০৪ টাকা। তবে এ বর্ধিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় সব আয়ের মানুষের মধ্যে সমান নয়। দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের জন্য এ বৃদ্ধি মাত্র দ্বিগুণ ছিল, যেখানে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের জন্য বৃদ্ধি ছয় গুণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধের দাম ব্যাপক হারে বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বেড়েছে তিন গুণ। এ সময় বিভিন্ন কোম্পানি তাদের উৎপাদিত ওষুধের দাম ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। করোনা ও করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাত মুনাফা সংকটে ভুগলেও ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ভালো প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলোর মুনাফার প্রবৃদ্ধি গড়ে ১৫ শতাংশের বেশি, যা বাংলাদেশের অন্য যেকোনো খাতের তুলনায় আকর্ষণীয়। ওষুধের দাম বাড়ায় অনেক কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও সামর্থ্যহীন মানুষজন ওষুধ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। 

এক্ষেত্রে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোকে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের দিকেও নজর দিতে হবে, যাতে তারা কম খরচে ওষুধ কিনতে পারে। বর্তমানে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজার রয়েছে। সরকার যদি ৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ কেনে, তাহলে মানুষ যে ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, সেটা ১৫ হাজার কোটিতে নেমে আসবে। অর্থাৎ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমে আসবে বলেও মনে করছে চিকিৎসাবিদরা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতার বিষয়ে জোর দিয়েছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলোয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যন্ত্রপাতি বাড়াতে হবে। যাতে সাধারণ মানুষ কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পায়। তাহলেই চিকিৎসা ব্যয় গড়ে ৪০-৫০ টাকার মধ্যে চলে আসবে বলে মনে করছেন চিকিৎসা গবেষকরা।

ক্যানসার, কিডনি রোগ বা পক্ষাঘাতের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে শেষ সম্বল ভিটা বা জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছেন। ওষুধ কোম্পানিগুলোকে আগ্রাসী নীতি পরিহার করতে হবে, দামি মোড়ক ব্যবহার বন্ধ ও উপহার দেয়া বন্ধ করলে ওষুধের দাম কমবে। 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। করোনাভাইরাস সংকট শুরু হওয়ার পরই স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থার চিত্রটি প্রকাশ পায়। দরকারি উপকরণের অভাব, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ, হাসপাতালে সেবার অভাব, নিয়োগ আর কেনাকাটায় একের পর এক দুর্নীতির সংবাদ যেন এ খাতের বেহাল দশাকেই তুলে ধরেছে। কিছু কিছু চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ডায়াগনস্টিক নির্ধারণ করে দেন। সেখান থেকে তারা অতিরিক্ত মুনাফাও পান। চিকিৎসকদের এ বাণিজ্য ঠেকাতে হবে। দেশে মানসম্পন্ন চিকিৎসকের সংখ্যাও দিন দিন কমছে। পেশাদারত্ব থেকে বেরিয়ে চিকিৎসকরা অনিয়মের জোয়ারে গা ভাসিয়েছেন। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে তারা বিভিন্ন অসদুপায় অবলম্বন করছেন। এ অবস্থা থকে বেরিয়ে আসতে হবে চিকিৎসকদের। স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়কে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকারের পদক্ষেপ কাম্য। বেসরকারি খাতে আকাশচুম্বী স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় কমিয়ে আনতে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ আসবে—এমন প্রত্যাশা সবার।