দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতির অবস্থা নাজুক। এরই মধ্যে গত কয়েকদিনে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান সংকটগুলো আরো তীব্র হয়েছে। মোটা দাগে বললে অর্থনীতির এ বেহাল দশার পেছনে অন্যতম কারণ অকার্যকর নীতি গ্রহণ। আর ভুল নীতির জন্য প্রধানতম দায়ী যে পরিসংখ্যানের অসংগতি, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া সঠিক নীতি গ্রহণ করা যায় না। এ কথা সর্বজনবিদিত হলেও দেশে পরিসংখ্যান বিভ্রাট কাটছেই না। রফতানি-আমদানির তথ্য থেকে শুরু করে এখন রাজস্ব আয়ের হিসাবেও দেখা দিচ্ছে বিরাট অংকের ফারাক। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ) রাজস্ব আহরণের তথ্যে পার্থক্য ৯৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকার বেশি।
বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যদিও পরে সংশোধিত লক্ষ্য নির্ধারণ হয় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের মতে, এ লক্ষ্যের বিপরীতে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব হয়েছে। আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন সিজিএর হিসাবে গত অর্থবছরে দেশে রাজস্ব আহরণ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮৫ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। দুই সংস্থার হিসাব অনুযায়ী এত বিস্তর ফারাক পাওয়া গেছে রাজস্ব আহরণের তথ্যে।
সরকারের কোষাগারে যে পরিমাণ অর্থ জমা হয় সেটির ভিত্তিতেই রাজস্ব আহরণের পরিসংখ্যান হিসাব করে সিজিএ। অন্যদিকে এনবিআরের পক্ষ থেকে অনেক সময় আদায়ের অপেক্ষায় থাকা অংকও রাজস্ব আহরণের পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অনেক সময় দেখা যায় এনবিআরের আহরণকৃত হিসেবে দেখানো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে আরো পরে। এছাড়া প্রণোদনা পেতে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজস্ব আহরণ বেশি দেখানোর প্রবণতা কাজ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিসংখ্যানগত এ ব্যবধান দূর করতে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমকে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করা প্রয়োজন। মানুষের হস্তক্ষেপ যত কমে আসবে, তথ্যগত ফারাকও কমে আসবে। মাল্টিপল ইনপুট এড়ানো সম্ভব হবে।
তবে রাজস্ব আয়ের ব্যবধান খতিয়ে দেখার জন্য একটি দল রয়েছে। সে দলের কার্যক্রম হলো উৎসে কর জমা না হওয়া সত্ত্বেও প্রদর্শিত হচ্ছে কিনা, পে-অর্ডার বা পেয়ি চেকের আদায় ট্রেজারিতে নিকাশ না হওয়া সত্ত্বেও আদায় হিসাব হয়েছে কিনা, আইবাসের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তথ্য প্রেরণ করেছে কিনা, সংশ্লিষ্ট আদায়কারী দপ্তরগুলো তাদের প্রতি মাসের আদায় বিবরণী পরবর্তী মাসের ২০ তারিখে সিজিএ দপ্তর কর্তৃক সংগ্রহপূর্বক সমন্বয় করে প্রেরণ করছে কিনা প্রভৃতি যাচাই-বাছাই করে তথ্য প্রকাশ করা। কিন্তু এ কাজের বাস্তব প্রতিফলন কেন নেই সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
আবার তথ্যের এমন অসংগতি নতুন কোনো ব্যাপার না। রাজস্ব আয়ের পরিসংখ্যানগত এ অসংগতির আগে রফতানির তথ্যগত ফারাক একাধিকবার পাওয়া গেছে এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি আয়ের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়টি দীর্ঘদিনের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংস্থা দুটির মধ্যে রফতানি আয়ের তথ্যে ফারাক ছিল ৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে এ পার্থক্য ছিল ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। এ দুই সংস্থার রফতানি আয়ের তথ্যে গরমিলের পরিমাণ সদ্যসমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এ অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) তথ্য বিভ্রাট দাঁড়ায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। উপরন্তু চলতি মাসের শুরুতেই দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) হিসাবায়ন করতে গিয়ে রফতানি তথ্যে সংশোধন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে ইপিবির অর্থবছরের ওই ১০ মাসের রফতানি আয়ের তথ্য থেকে এক ধাক্কায় ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার বাদ দিয়ে দেয়া হয়। ফলে বদলে যায় ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) অনেক হিসাবও। রফতানির পাশাপাশি রিজার্ভের তথ্য নিয়েও বিভ্রাট সৃষ্টি হয়। দেশে গ্রস রিজার্ভ নিরূপণে আগে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বাজার পর্যবেক্ষকরা। পরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী বিপিএম৬ পদ্ধতিতে গ্রস রিজার্ভ ও ব্যবহারযোগ্য তথা নিট রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ শুরু হয়। গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম৬ পদ্ধতিতে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। একই দিনে দেশের ব্যবহারযোগ্য বা নিট রিজার্ভ ছিল ১৬ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। এভাবে একের পর এক সরকারি সংস্থার প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই আস্থাহীনতা তৈরি করছে। অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে সঠিক নীতি গ্রহণ।
পরিসংখ্যাগত বিভ্রাটের সমাধান করতে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। নয়তো ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই বাজারেই আস্থাহীনতার সংকট তীব্র হবে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্বাসযোগ্য না হলে তা সঠিক নীতি গ্রহণ ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। যা বিরাজমান অর্থনৈতিক সংকটগুলোকে আরো দীর্ঘ করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে কমবেশি ফারাক সবসময়ই থাকে এবং এর কারণ হলো পদ্ধতিগত। কিন্তু পদ্ধতিগত কারণে পার্থক্য খুব বেশি হওয়ার কথা না। যদি পার্থক্য খুব বেশি হয় তাহলে সেটি উদ্বেগের বিষয়। যেকোনো বিষয়ে একক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা উচিত কিংবা ‘প্রকৃত’ পরিসংখ্যান যেকোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ করা উচিত। সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশে তৎপর না হলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার যথেষ্ট কঠিন হবে।










