দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি ও উজানের ঢলের ফলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে বন্যার আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে যথোপযুক্ত প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বন্যার্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। প্রাকৃতিক এ তাণ্ডবের কাছে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। তবুও ভাঙনকবলিত এলাকায় শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোও প্রস্তুত করা হয়। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় মানবিক সহযোগিতা। এজন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার প্রয়োজন দেখা দেয়।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ভারি বৃষ্টিপাত এবং উজানের ঢলে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে স্বল্প দিনের ব্যবধানে আবার রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় বন্যার আশঙ্কা করছে নদী এলাকার মানুষ। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতলে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে যমুনার পানি সমতলে স্থিতিশীল হলেও উভয় নদীর পানি সমতলে বৃদ্ধি পেতে পারে। ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য নদী ধরলা, দুধকুমার ও করতোয়ার পানিও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলার কিছু অংশ, নীলফামারী জেলার জলঢাকা ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা, গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা এবং কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার কিছু অংশে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বৃদ্ধি পেলেই রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী, চর বাগডহরা, মিনাবাজার, আলমবিদিতর ইউনিয়নের ব্যাঙপাড়া কোলকোন্দ ইউনিয়নের চর বিনবিনা, মটুকপুর, লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের শংকরদহ, ইচলি, জয়রামওঝা, চল্লিশসাল ও গজগণ্টা এবং মর্ণেয়া ইউনিয়নের বেশকিছু এলাকার নিম্নাঞ্চল প্রথমে প্লাবিত হয়। তাই স্বল্প দিনের ব্যবধানে আবার বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কায় আছে নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষ।
ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বৃদ্ধির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ এবং হাতীবান্ধা ও নীলফামারীর ডিমলা নদী এলাকার বাসিন্দারা। এদিকে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবারো বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি। এতে নদীপাড়ের মানুষ বন্যার আশঙ্কায় দিন পার করছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী অববাহিকার নিচু এলাকাগুলোয় পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের গতিয়াসাম, চর খিতাবখা, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চতুড়া, রামহরি ও কালিরহাট এলাকায় দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। অন্যদিকে ভাঙন দেখা দিয়েছে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি পয়েন্টে এবং ধরলা অববাহিকার মোগলবাসা ইউনিয়নের চরসিতাইঝাড় এলাকায়। তিস্তাপাড়ের মানুষ ভাঙন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। এ এলাকায় গত তিন মাসে ৩০টির মতো পরিবার নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছে। বর্তমানে খিতাবখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ স্থানীয়দের ঘরবাড়িও হুমকির মুখে।
বৃষ্টিপাতের ফলে নিচু এলাকার অনেক আমন খেতে পানি জমে আমন চারা তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নিচু এলাকার আমন খেত তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোয় জরুরি ভিত্তিতে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে উজানে ভারি বৃষ্টিপাত কমে এলে বন্যার আশঙ্কা থাকবে না।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নদীর অববাহিকা, চর, দ্বীপচরের মানুষদের সতর্ক থাকাসহ প্রয়োজনে আশ্রয় কেন্দ্রে সরে যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। উজানের ঢলের কারণে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চলমান বৃষ্টি আগস্টজুড়েই চলবে। তবে তা থেমে থেমে নানা জায়গায় হবে। কোথাও ভারী আবার কোথাও মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে।
চলতি মাসের বৃষ্টি ২০ তারিখের পরে বাড়তে পারে, এ বিষয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তাই এক্ষেত্রে প্রস্তুতির ঘাটতি থাকার কথা নয়। তার পরও বন্যা যদি এসেই যায়, তখন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে বন্যার্ত মানুষ যেন আশ্রয় কেন্দ্রে সময়মতো পৌঁছাতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যার পর যেসব পানিবাহিত অসুখ-বিসুখ ছড়ায়, সেসব যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে এজন্য পর্যাপ্ত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সংগ্রহে রাখতে হবে। এছাড়া বন্যার্ত মানুষের নিরাপত্তায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও বজায় রাখতে হবে। সর্বোপরি, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মেনে নিয়েই যেহেতু নদী পাড়ের মানুষকে বাঁচতে হয়, সেজন্য দুর্যোগ মোকাবেলার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখা দরকার। আমরা প্রত্যাশা করব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করবে। সেই সঙ্গে ত্রাণ কার্যক্রমে সামর্থ্যবান সবার অংশগ্রহণও একান্তভাবে কাম্য। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে আমরা দুর্যোগকালীন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব, অতীতের উদাহরণ সামনে রেখে এ আশাবাদ রইল।










