পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থার জন্য মন্দ একটি বছর হিসেবে দেখা দিয়েছে ২০২৩। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, অনেকেই চীনের নেতৃত্বে একটি বিকল্প ব্যবস্থা উত্থানের আশঙ্কা এ খারাপ সময়ের প্রাথমিক কারণ হবে বলে ভাবলেও মূলত ঘটনা তা দাঁড়ায়নি। বরং বিষয়টিতে অভ্যন্তরীণ চাপের বিষয় ছিল, যা পশ্চিমা অর্থনীতির কার্যকারিতা এবং বৈধতা সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে আরো সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছে।
তবে শিগগিরই কোনো নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যেসব দেশ পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বিপরীতে বিকল্প হিসেবে নিজ অবস্থান জানান দেয়ার চেষ্টা করছে তারাই বিশ্ব অর্থনীতি খণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের জায়গা যদি হুমকিতে পড়ে তাহলে বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ২০২৩ সালের আগেই পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনীতি নিয়ে সন্দেহের সূত্রপাত হয়েছিল। মাত্র ১৫ বছরে এ পদ্ধতি নীতিগত ভুল পদক্ষেপের কারণে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এবং তার মসৃণ কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা একের পর এক ব্যাঘাতেরও জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিষেধাজ্ঞার ক্রমবর্ধমান অস্ত্রীকরণ, কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের অসম বণ্টন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রাস্ফীতিকে অস্থায়ী” হিসেবে ভুল চরিত্রায়ণ এবং ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী সুদের হার বৃদ্ধির পরিণতি কেবল বেড়েছে বৈ কমেনি।
‘জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্লোবাল সাউথের বেড়ে চলা অপ্রতিরোধ্য কর্জ’-এর মতো দুটো জরুরি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এ পদ্ধতির অক্ষমতার কারণে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ নেতিবাচক চাপ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমা আধিপত্য বিস্তারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের অন্তর্ভুক্তিকে সাধারণ জনগণ অপর্যাপ্ত হিসেবে দেখা শুরু করেছে।
এ বছর বিশেষ করে দুটো বিষয়ে উন্নয়ন পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আদেশের বিষয়ে আমাদের মনে ব্যাপক হতাশার জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, রাশিয়া দৃশ্যত শ্বাসরুদ্ধকর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সক্রিয় বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম সুইফট ব্যবহার সীমিত করা কিংবা জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার পরও তেমন ঝুঁকিতে পড়েনি রুশ অর্থনীতি। বিষয়টি ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত করা হলেও রাশিয়ান টেকনোক্র্যাটদের দ্বারা প্রণীত অ্যাডহক বাণিজ্য এবং অর্থ প্রদানের স্কিমগুলো একেবারেই ব্যয় কার্যকরী নয়, বরং সে বিষয়গুলো রাশিয়াকে তার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষতি কমাতে এবং ইউক্রেনে তার যুদ্ধ প্রচেষ্টার অর্থায়ন করতে সক্ষম করেছে।
রাশিয়া ক্রমবর্ধমান (যদিও তুলনামূলকভাবে ছোট) দেশগুলো থেকে সমর্থন পেয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শাসনের বা স্যাংশনের সীমিত সাফল্য ‘বিশ্বের দেশগুলোর পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই—এ জাতীয় ভ্রান্ত বিশ্বাসকে মুছে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে পশ্চিমাদের অসংগতিপূর্ণ আচরণে বিবৃত প্রতিশ্রুতির রিক্ততা উন্মোচিত হয়েছে।
আমার সাম্প্রতিক ভ্রমণের সময় আমি এমন অনেক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেছি যারা গাজায় বেসামরিক অংশ তথা সাধারণ মানুষের জন্য সুরক্ষার অভাব, গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পতন, জাতিসংঘের মানবিক কর্মীদের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যু এবং আসন্ন পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেসের কঠোর সতর্কতা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ব্যাপক অনাহার, রোগব্যাধি, নাগরিক ব্যাধি এবং সাধারণ নাগরিকদের বিশাল পরিসরের বাস্তুচ্যুতিও আমার নজর এড়ায়নি। যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি স্বীকার করেছেন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এখন বিশ্বাস করে যে ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল যা করেছে তা অনেক ভয়াবহ। এতে আন্তর্জাতিক পরিসরে সমর্থন হারিয়েছে৷ইসরায়েল। সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ১৫৩টি দেশ সমর্থন দিয়েছে। মাত্র ১০টি ভোট পড়েছে ইসরায়েলের অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। এছাড়া ২৩টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে।
উল্লেখযোগ্য বেশকিছু দেশ ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে দায়মুক্তি দেয়ার বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং হাজার হাজার নারী ও শিশুসহ বেসামরিক নাগরিকদের বোমা মারার অনুমতির জন্য তাদের ঘৃণা প্রকাশ করেছে। পূর্বাঞ্চলের দিকে থাকা ফিলিস্তিন শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্ম সংস্থার কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনির সতর্কবার্তায় অনেকেই আতঙ্কিত, তিনি গাজার বর্তমান অবস্থাকে ‘পৃথিবীতে নরক’ বলে বারবার আখ্যায়িত করেছেন।
গাজায় মানবিক সংকট বেড়ে যাওয়া নিয়ে বেশ কয়েকটি দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বলছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিকটতম মিত্রকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে বড় আকারের ভুল করেছে। গাজায় মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবে মার্কিন ভেটো দেয়ার ঠিক একদিন পর বাইডেন প্রশাসন কংগ্রেসকে বাইপাস করে বা এড়িয়ে ইসরায়েলকে আরো সামরিক সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক এ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণসাপেক্ষে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এর ফলে একমুখী (ইউনিপোলার) বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে বহুমুখী (মাল্টিপোলার) বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে অভিগমন ত্বরান্বিত হচ্ছে। মাঝারি শক্তির দেশগুলো যেভাবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে তাতে পশ্চিমাদের সঙ্গে যুক্ত ছোট দেশগুলোকে সুইং স্টেট (দুই বলয় সমর্থক বা বলয় নিরপেক্ষ) হওয়ার দিকে ধাবিত করবে।
এ ঝুঁকিকে পশ্চিমা বিশ্বকে সরাসরি মোকাবেলা করতে হবে। এরই মধ্যেই যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে; তবে রাজনৈতিক নেতাদের বিদ্যমান বহুপক্ষীয় স্থাপত্যকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে আরো বিভক্তির আশঙ্কা কমানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন। তারা আন্তর্জাতিক ব্যাধির দ্রুত অবসান করার বিষয়েও মনোনিবেশ করতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পূর্ববর্তী সংস্কারের উদ্যোগগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে এ প্রচেষ্টা শুরু করা উচিত। প্রতিবাদ ও প্রতিনিধিত্বের ওপর প্রাথমিকভাবে গুরুত্বারোপ করতে হবে। অপারেশনাল পদ্ধতির আধুনিকীকরণ করতে হবে এবং পশ্চিমা স্বার্থকে উপকৃত করার মতো পুরনো নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো ভেঙে দিতে হবে।
ওই সংস্কারের জায়গাগুলো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের পর থেকে বিশ্ব পরিচালনায় ভূমিকা পালন করে চলেছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামোকে যদি ব্যর্থ হতে দেয়া হয় তবে এটি চীনের পরিচালিত কোনো নতুন ব্যবস্থা নয়, বরং অন্য কোনো উদীয়মান বৈশ্বিক ব্যাধি দ্বারা প্রতিস্থাপন হবে। এ জাতীয় ফলাফল স্বল্পমেয়াদে অনেকেরই ক্ষতির কারণ হবে এবং আমাদের জটিল ও ক্রমবর্ধমান দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার সম্মিলিত ক্ষমতাকেও বাধা দেবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
মোহাম্মদ এ এল এরিয়ান: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স কলেজের প্রেসিডেন্ট, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্টন স্কুলের অধ্যাপক এবং দ্য অনলি গেম ইন টাউন: সেন্ট্রাল ব্যাংকস, ইনস্ট্যাবিলিটি অ্যান্ড অ্যাভয়েডিং দ্য নেক্সট কলাপসের লেখক
ভাষান্তর: নূসান্তা সামায়েল অদ্রি










