কয়েক মাস ধরেই নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচন নিয়ে একটা তোলপাড় চলছিল। তোলপাড়টি ৩৪ বছরের একটি টগবগে তরুণকে নিয়ে, যিনি ঘোষণা দিলেন যে নিউইয়র্কের আসন্ন মেয়র নির্বাচনে তিনি ডেমোক্রেটিক দল থেকে প্রার্থী হবেন। যুবকটির নাম জোহরান মামদানি। মা ভারতীয় (বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মীরা নায়ার), বাবা উগান্ডান (কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি)। ধর্মবিশ্বাসে জোহরান মুসলমান ও বিয়ে করেছেন সিরীয় রামা দুয়াজী। বহুমাত্রিক আত্মপরিচয়ের একটি জাজ্বল্যমান উদাহরণ যেন। নিউইয়র্কের বহুধামাত্রিক জনপদ আকৃষ্ট হলো তার দিকে, তার তারুণ্য উজ্জীবিত করলেন মানুষকে, তার সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব মোহিত করলেন সব গোষ্ঠীকে, তার সত্য কথনে আস্থা আর আশ্বাস পেলেন নিউইয়র্কবাসী ও নিউইয়র্কের জন্য করণীয় তার পরিকল্পনার সঙ্গে এক ধরনের অনুরণন খুঁজে পেলেন নিউইয়র্কের নাগরিকরা। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। প্রাথমিক বাছাইয়ে ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন পেয়ে অতি সম্প্রতি বহু কিছুতে ‘প্রথম’ অভিধা নিয়ে জোহরান মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।
বিস্ময়ের চোখে দেখল সারা বিশ্ব এ অভাবিত ঘটনাকে। উৎসবের বন্যায় ভেসে গেল সারা নিউইয়র্ক। নানা ধর্মের, নানা বর্ণের, সব আত্মপরিচয়ের, নারী-পুরুষ-শিশু বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। উৎসবের এ অনুরণন ছড়িয়ে সারা যুক্তরাষ্ট্রে ও সেই সঙ্গে সারা বিশ্বে। ট্রাম্পের কূটচাল, ভীতিপ্রদর্শন এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের অন্ধকারময় জগৎ ছাড়িয়ে মানুষ যেন একটা আশার আলো দেখতে পেল, তাদের মনে হলো, একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ও এ মুহূর্তে একটা বিরাট প্রত্যাশা তাদের যে শুভবুদ্ধির একটা সুবাতাস বয়ে যাক।
কয়েক দিনের মধ্যেই মানুষের উপর্যুক্ত আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সময়কাল পেরিয়ে যাবে। চারপাশের বাস্তবতা তার নগ্ন সত্য নিয়ে আবির্ভূত হবে। সে বাস্তবতা যে সবসময়ে সুখকর হবে তাও নয়। তাই জোহরান বিষয়ে কোন কোন দিকে সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে জোহরান প্রশাসনকেও সতর্কভাবে তার কার্যধারা নির্ধারণ করতে হবে, কারণ নিউইয়র্ক একটি জটিল শহর ও বর্তমান সময়টিও একটি অস্থির সময়।
জোহরান বিষয়ে তিনটা বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। প্রথমত, আমরা এরই মধ্যে জোহরান মামদানির নানা ‘প্রথম’ তকমা থেকে আমাদের নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছি। যেমন নিউইয়র্ক শহরের ‘প্রথম মুসলিম’ মেয়র, প্রথম ‘ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র’ কিংবা ‘জেনারেশন ওয়াই থেকে প্রথম’ নির্বাচিত মেয়র, অথবা গ্রেসি ম্যানসনে নগরীর ‘প্রথম অশ্বেতাঙ্গ পরিবার’ ইত্যাদি। ‘প্রথমে’ ‘প্রথমে’ একাকার! এর পেছনে নিজ নিজ প্রেক্ষিত থেকে আমাদের প্রত্যেকের একটি গর্বিত আবেগী উচ্ছ্বাস কাজ করে সন্দেহ নেই, কিন্তু এর ফলে দুটো ব্যাপার ঘটে যায়। এক. এর ফলে আমরা জোহরান মামদানিকে খণ্ডিত করে ফেলি এবং তার আত্মপরিচয়ের বহুমাত্রিকতার শক্তিকে নষ্ট করে তাকে আমরা দুর্বল করে ফেলি। তাকে তখন আমরা আমাদের গোষ্ঠীর প্রতিনিধি বানিয়ে ফেলি ও এর ফলে তিনি নেতৃত্বের সর্বজনীনতা হারান ও সারা নিউইয়র্কের নেতা হওয়ার বদলে শহরটির একটি খণ্ডের নেতা বনে যান।
সেই সঙ্গে নির্বাচনের সময়ে যারা তাদের নিজস্ব বর্ণ, ধর্ম, আত্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে সমন্বিতভাবে মামদানিকে ভোট দিয়েছেন, নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে আমরা খণ্ডিত করলে আমরাও বিভাজিত হয়ে যাই। নিউইয়র্কের মতো জটিল বৈচিত্র্যপূর্ণ শহরে সামাজিক সংহতি ও বন্ধনের জন্য এ জাতীয় বিভাজন শুধু যে অনভিপ্রেত তাই নয়, বিপজ্জনকও বটে। নিউইয়র্কের মানুষ তাদের বৈচিত্র্য বজায় রেখে সংহতভাবে বাঁচতে চায়।
দ্বিতীয়ত, উপর্যুক্ত প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ তিনি যদি সর্বজনীন নেতা হিসেবে কাজ করতে যান, তাহলে যে গোষ্ঠী তাকে তাদের গোষ্ঠীগত আত্মসত্তার উর্দি পরিয়ে দিয়েছিলেন, তারা রুষ্ট হন। অন্যদিকে তিনি যদি ওই গোষ্ঠীর দিকেই মনোযোগ বেশি দেন, তাহলে পক্ষপাতিত্বের কারণে তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় ও শাসন করার নৈতিক শক্তিও তার বিনষ্ট হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট ওবামার ক্ষেত্রেও আমরা এটা দেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে বারবার আখ্যায়িত হওয়ায় তার কর্মকাণ্ডে তার কৃষ্ণাঙ্গত্ব সম্পর্কে তিনি এত সচেতনভাবে সতর্ক হয়ে গেলেন যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার কার্যকারিতা বিঘ্নিত হলো। কৃষ্ণাঙ্গরা ভাবলেন যে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের জন্য কিছুই করেননি। অন্যরা বলতে থাকল যে প্রেসিডেন্ট ওবামা নিজে কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ায় তিনি তাদেরকে অযাচিত সুবিধা দিচ্ছেন।
তৃতীয়ত, এটা মনে রাখা দরকার যে জোহরান মামদানি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন শতকরা ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী একটি প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য নিউইয়র্ক রাজ্যের সাবেক গভর্নর ও প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মন্ত্রিসভার সদস্য অ্যান্ড্রু কোমো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পেয়েছেন ৪১ শতাংশ ভোট। একদম কম ভোট পাননি। আমার মতে, এখানে তিনটা কথা জানা দরকার। এক. এ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভোট ভাগ হয়ে গেছে। কারণ ঐতিহ্যগতভাবেই কোমো পরিবার দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ডেমোক্রেটিক পরিবার। অ্যান্ড্রু কোমোর বাবা মারিও কোমোও এক সময়ে নিউইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর ছিলেন। সুতরাং তাদের একটি বিরাটসংখ্যক পরীক্ষিত অন্ধ অনুসারী আছে। তাদের ভোট জোহরান মামদানি পাননি, পেয়েছেন অ্যান্ড্রু কোমো। দুই. জোহরান মামদানির ভোটের মূল উৎস ছিল নিউইয়র্ক শহরের অভিবাসী গোষ্ঠী। নিউইয়র্ক শহরের ধনিক শ্রেণীর ভোটও তিনি পাননি। তিন. ইহুদি ভোটও মামদানির পক্ষে যায়নি এবং এটাও সবার জানা যে নিউইয়র্কের পরিপ্রেক্ষিতে এ তিনটা বাস্তবতা মামদানির কর্মকাণ্ডের জন্য বিবেচ্য বিষয়।
মেয়র হিসেবে পথযাত্রা শুরু করতে গিয়ে জোহরান মামদানিকে কয়েকটি আদর্শিক ও প্রায়োগিক বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে। প্রথমত, কোনো খণ্ডিত আত্মপরিচয়কে প্রশয় না দিয়ে তার বহুমাত্রিক আত্মপরিচয় ধারণ করেই তাকে এগিয়ে যেতে হবে। তার কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হবে তার ঘোষণপত্র ও প্রতিশ্রুতির আদর্শিক ভিত্তি। সেসবে তিনি মানবাধিকার, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সৌহার্দ, সামাজিক সংহতির দৃঢ়করণ, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদির কথা বলেছেন। এগুলোর বাস্তবায়নের নগরাধ্যক্ষ হবেন তিনি। তাকে সাহায্য করার জন্য দক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি প্রশাসন দল তাকে নিয়োগ করতে হবে নগর ভবনে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ডেমোক্রেটিক দলের মধ্যে নানা ফাটলের কথা আগেই বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে ঘটেছে নানা গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন ও ফারাক। নতুন মেয়রকে ঐক্যের দূত হয়ে সেসব ক্ষতির মেরামত করতে হবে। যারা তার বিপক্ষে ছিলেন, তাদেরকেও নিয়ে আসতে হবে তার তাঁবুতে। কাজটি কঠিন , কিন্তু সেটি করার মতো বর্ণিল ব্যক্তিত্ব তার আছে। তৃতীয়ত, তিন দশকের মতো সময়ে নিউইয়র্কে বসবাস করে আমি জানি যে শহরটির অবকাঠামো ভেঙে ভেঙে পড়ছে এবং শিক্ষা, আবাসন ও স্বাস্থ্যের মতো জরুরি সেবা খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। এ শহরকে মানববান্ধব করতে হলে ও নাগরিকদের যাপিত জীবনকে উন্নত করতে হলে এদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
চতুর্থত, এটা নিশ্চিত যে ট্রাম্প প্রশাসন মামদানি প্রশাসনের জন্য পদে পদে অন্তরায় সৃষ্টি করবে। এর মধ্যেই তারা বলেছে যে সে প্রশাসন নিউইয়র্ক শহরে সব অনুদান বন্ধ করে দেবে। সে অবস্থায় বিকল্প অর্থায়নের কথা ভাবা প্রয়োজন। নতুন মেয়রকে কংগ্রেসে, বেসরকারি খাতে, ওয়াশিংটন ও আলবেনীতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এক ধরনের সহযোগিতা-আঁতাত গড়ে তুলতে হবে। সে লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্য ও দেশের বাইরে সফরের কথাও ভাবতে পারেন।
পঞ্চমত, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জোহরান মামদানি একা নন। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা নতুন নতুন ভূমি জয় করেছেন। ভার্জিনিয়ার গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাবিগেল স্প্যানবার্গার ও ভার্জিনিয়ায় গভর্নর হয়েছেন মিকি শেরিল। এদেরকে মামদানি সহযাত্রী হিসেবে পাবেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। ৩ নভেম্বর জোহরান মামদানিই শুধু ইতিহাস গড়েননি, ইতিহাস গড়েছেন অ্যাবিগেলও ভার্জিনিয়ার ইতিহাসে প্রথম নারী গভর্নর হিসেবে। সে অর্জনও কম নয়।
আপাতত এখান থেকেই জোহরান মামদানির পথচলা শুরু হতে পারে। জানি, সামনে তাকে নানা চড়াই-উতরাই পার হতে হবে। বিশ্বাস রাখি তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞা, মেধা বুদ্ধি-বিবেচনা তার আছে, আছে তার বিশ্বাসযোগ্য একটি পরামর্শক দল। এ মুহূর্তে জোহরান মামদানির জন্য পৃথিবীর সবটুকু শুভেচ্ছা আর শুভকামনা।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র










