প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রফতানি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামে-গঞ্জে-মফস্বলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, অতিদারিদ্র্য আগের চেয়ে কমেছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা পৌঁছাচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। কিন্তু এ কথা বলা যাচ্ছে না রাজধানী ঢাকাসহ অন্য মহানগরীগুলোর ক্ষেত্রে। দুই কোটিরও বেশি লোকের বাস ঢাকায়। কিন্তু নাগরিক সুবিধা কতটুকু বিস্তৃত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ কিংবা কিছু গোষ্ঠীর কাছে প্রচুর অর্থ-বিত্ত পুঞ্জীভূত হলেও দারিদ্র্য বাড়ছে রাজধানীতে। বণিক বার্তায় প্রকাশ, জাতীয় পর্যায়ে ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ এ সময়ে কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। কিন্তু সারা দেশে দারিদ্র্য কমলেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ঢাকায়। এখানে দারিদ্র্য না কমে উল্টো প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ঢাকা বিভাগে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ঢাকা একাই পেয়েছিল এডিপির মোট বরাদ্দের ৩৮ শতাংশ অর্থ। দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জিডিপির বড় জোগানদাতা ঢাকা বিভাগ। বৈদেশিক রেমিট্যান্সেও বড় অবদান এ বিভাগের। এর পরও এখানে দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ঘিরে এক ধরনের গোষ্ঠীতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে রাজনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগীরা উন্নয়ন বরাদ্দ ও সামাজিক নিরাপত্তার ভাগ নিয়ে গেলেও যাদের পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছে না। আর আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি সেভাবে। কারো কারো মতে, বিভিন্ন এলাকা থেকে গরিব মানুষ কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসায় এখানে দারিদ্র্য বেড়েছে। কেউ কেউ করোনার প্রভাবকেও একটি বড় কারণ বলে মনে করছে। মূল্যস্ফীতির অভিঘাতেরও ভূমিকা থাকতে পারে। 

গবেষকরা বলছেন, এখানকার দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ভঙ্গুর। তাই সামান্য ধাক্কায়ই মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। অর্থাৎ গরিব মানুষ দারিদ্র্যসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। 

বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০২২-এর তথ্যমতে, গত ছয় বছরে জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য বেড়েছে ঢাকায়। ২০১৬ সালে এ বিভাগে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৬ শতাংশ। ২০২২ সালে এটি প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশে। এ সময় ঢাকা বিভাগের গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় আড়াই শতাংশ। ২০১৬ সালের ১৯ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে এটি ২১ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ১২ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। গত মে মাসে বিআইডিএসের এক গবেষণায় করোনাকালে ঢাকায় দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। আর মোট দরিদ্র মানুষের ৫১ শতাংশকে ‘‌নতুন দরিদ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। 

বেশি বরাদ্দ পেয়েও দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ঘিরে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা নেয়ার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঘিরে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত একটি পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে উন্নয়ন বরাদ্দ ও সামাজিক নিরাপত্তা যাদের পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছেন না। আর বিগত সময়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়েনি। তাই অনানুষ্ঠানিক খাতের কম মজুরি দিয়ে মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারছে না। আবার কাজের সন্ধানে অন্য শহর থেকে গরিব মানুষ এখানে ভিড় করছে। কিন্তু গ্রামের মতো এখানে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ নেই। ফলে এখানে সামাজিক নিরাপত্তার বড় রকমের দুর্বলতায় শহুরে দারিদ্র্য বেড়েছে।

জনসংখ্যা ও আয়তনে শহরের আকার বাড়লেও নাগরিক সেবা ব্যাপৃত হয়নি। ঢাকা শহরের বাসা ভাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে। গড়ে ওঠেনি সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থা। এতে বাসা ভাড়া ও পরিবহন খাতে ব্যয় হচ্ছে সিংহভাগ অর্থ। এছাড়া বেসরকারি ভালো কিছু স্কুল-কলেজ থাকলেও সরকারি ব্যবস্থায় নেই পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষাব্যয়ও আকাশচুম্বী। তারপর রয়েছে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। অপ্রতুল সরকারি হাসপাতালগুলোর বিপরীতে গলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসায় প্রচুর অর্থ ব্যয় করেও সঠিক চিকিৎসা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জোটে না নগরবাসীর। উচ্চ বাসা ভাড়া, পরিবহন ব্যয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে নগরবাসীর জীবনযাপন ব্যয় অনেক বেশি। তার ওপর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতিতে নাকাল সাধারণ মানুষ। দেখা গেছে, শহরে উচ্চ জীবনযাপন ব্যয় নির্বাহে নিম্ন মধ্যবিত্ত অনেকেই দারিদ্র্যে পড়ছে কিংবা নিম্নবিত্তরা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এছাড়া উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা চাকরি হারালেও অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। করোনা মহামারীর সময় এমন চিত্র বেশি দেখা গেছে। করোনা মহামারীর প্রভাব শেষ হলেও অর্থনীতিতে তার অভিঘাত শেষ হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ঢাকায় ব্যয় হলেও এখানে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। 

সর্বস্তরের মানুষকে মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা না নেয়া, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হওয়া, একটি গোষ্ঠীর লুটপাট ও দুর্নীতি, সুশাসন ও  দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে ঢাকার নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ। বিকল্প ব্যবস্থার অভাবে অল্প যে সুযোগ-সুবিধা আছে তা রাজধানীতে পুঞ্জীভূত হওয়ার কারণে এ শহর ছেড়ে যেন কোথাও যেতেও পারছে না মানুষ। নাগরিক জীবনের দুর্দশা লাঘবে যেসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেয়ার কথা ছিল তাদের নেতৃত্বেই দেখা গেছে পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। বসবাসযোগ্যতা, বায়ু ও পরিবেশ দূষণের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ শহরের তালিকায় ওপরের সারিতে রয়েছে ঢাকা। এর মধ্যে উচ্চ জীবনযাপন ব্যয়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত, দরিদ্র্য ও প্রান্তিক মানুষ খুব চাপে আছে। এ অবস্থায় সবার জন্য সুষম উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করলে, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ঢেলে না সাজালে ঢাকাবাসীর অবস্থা আরো নাজেহাল হবে। নিম্ন আয়ের দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের পর বলা হচ্ছে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। রাজধানী ঢাকায় এ অসম উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির মাধ্যমে কি তা সম্ভবপর হবে? জনমিতিক লভ্যাংশ ঘরে তুলতে চাইলে সবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, শিক্ষার মানোন্নয়ন করে প্রশিক্ষিত জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে তরুণ প্রজন্মকে। আবাসন ব্যয় কমাতে বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য সংগতিপূর্ণ আবাসন ব্যবস্থা এবং পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি ঢেলে সাজিয়ে সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করা দরকার। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উচ্চ ব্যয় কমাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতা ও পরিষেবা বৃদ্ধি জরুরি। বাজারে সিন্ডিকেটের আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, টিসিবির কার্যক্রম বিস্তৃত করে সাশ্রয়ী মূল্যে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পণ্য বিক্রি বাড়ানো আবশ্যক। সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ও নগর কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপে ঢাকায় দারিদ্র্যের হার কমবে এবং নাগরিক জীবন স্বস্তিদায়ক হবে—এমনটিই সবার কাম্য।