বায়ান্ন বছর আগে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। সংবিধানে গণতন্ত্রসহ চারটি মূলনীতি নিয়ে এগিয়ে চলার যাত্রা হয় শুরু। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চাকে প্রাধান্য দিয়ে ১৯৭৩ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেশে অনুষ্ঠেয় দ্বাদশতম সাধারণ নির্বাচনের আগে এটুকু বলা যায় যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ভাবধারা মুমূর্ষুপ্রায়, আর বেঁচে নেই। গণতন্ত্রকে উপজীব্য করে দেশ পরিচালনা করতে আসা বর্তমান বা বিগত সময়ের ক্ষমতাসীন দলগুলোর মধ্যে যেমন গণতান্ত্রিক নীতি থেকে বের হয়ে আসার প্রবণতা লক্ষণীয়; তেমনি তাদের আচরণে একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের কাছে গণতন্ত্র নিয়ে নির্লিপ্ততার পাশাপাশি এলিট শ্রেণীর কাছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের এলিট শ্রেণীকে নানা ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আমলা, সামরিক-বেসামরিক, ব্যবসায়ী অথবা শিল্প-সাহিত্যে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের সদস্য পদ অর্জন করা হছে রাজনৈতিক এলিট হওয়ার প্রথম ধাপ। বাংলাদেশে রাজনৈতিক এলিট শ্রেণী বলতে রাজনৈতিক দল এবং তার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের কথা বোঝায়। দল থেকে নির্বাচিত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পরবর্তী সময়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৪০-৫০ জন সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। সংসদের সাধারণ সদস্যসহ সরকার এবং বিরোধী দলের সব সদস্য রাজনৈতিক এলিট বলে গণ্য হয়ে থাকেন। রাজনৈতিক এলিট ছাড়াও বাংলাদেশ সামরিক-বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের এলিট বলে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এর মধ্যে আছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত সরকারি আমলা; শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক, সামরিক প্রতিষ্ঠানের নেতারা; শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।
বাংলাদেশে এলিট হওয়ার দৌড় প্রতিযোগিতার ধাপ অতিক্রম করে অতীতে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষকে সংসদের সদস্য পদ অর্জন করতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মোট সংসদ সদস্যের ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ সংখ্যা ছিল ৫৪ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ১৮২ জন (৬১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ) সংসদ সদস্য নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘ব্যবসায়ী’ কথাটি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। ফলে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক এলিট চরিত্রের মধ্যে ব্যবসায়ী মহলের প্রাধান্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলাফল হিসেবে ব্যবসায়ী মহলের তথা অর্থনৈতিক এলিটদের শ্রেণীস্বার্থ সুরক্ষায় সরকারকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকার পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ী মহলের পুতুলে রূপান্তরিত হচ্ছে। রাজনৈতিক এলিটদের পাশাপাশি অর্থনৈতিক এলিটদের অনাগ্রহের কারণেও গণতন্ত্র কোনোভাবেই ক্ষমতা পালাবদলের রূপরেখা হয়ে উঠছে না।
এ অবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে কোনো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এলিট শ্রেণী এবং জনগণের মধ্যে টাগ অব ওয়ার বলা হলেও গবেষকদের মতে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত বাস্তবায়নে এলিট শ্রেণী জনগণের পক্ষশক্তি হয় না। উল্টো এলিট শ্রেণীকে অনেক দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অথবা গণতান্ত্রিক সংস্কারে নীরব থাকতে দেখা যাচ্ছে। এলিট শ্রেণী ও জনগণের টানাপড়েনে গণতন্ত্র দেশে দেশে বিপথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে।
বাংলাদেশ গণতন্ত্রের বেহাল দশার কারণ হিসেবে কেউ কেউ কিছু পূর্বশর্ত পূরণের অভাবকে দায়ী করেছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রথম যে শর্ত পূরণের কথা তারা বলেছেন তার মধ্যে রয়েছে দেশে সামন্তবাদী এবং অনুন্নত আর্থসামাজিক কাঠামোর উপস্থিতি। এক কথায়, বাংলাদেশে সামন্তবাদী এবং অনুন্নত আর্থসামাজিক কাঠামো বিরাজ করছে যা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অন্তরায়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সামন্তবাদী ভাবধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে হবে। দ্বিতীয় পূর্বশর্ত হিসেবে কেউ কেউ দাবি করেছেন যে গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশে উদারনীতির বিকাশ যেমন হয়নি, তেমনি গণতন্ত্রের জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভূমিকা যথাযথ নয়। তবে এসব শর্ত পূরণ ছাড়াই পৃথিবীর বহু দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আরেক দল গবেষক মত দিয়েছেন। এছাড়া বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোও অনেক উন্নত। অন্যদিকে উদারনীতির বিকাশকে বাংলাদেশের জন্য অনেকে উপেক্ষিত বিষয় বলে ধরে নিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, কোনো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এলিট শ্রেণী কখনই সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেনি। সেজন্য এলিট শ্রেণীকে গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি না বলে শত্রু বলাই শ্রেয় বলে কেউ কেউ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
অধ্যাপক আলী রিয়াজের মতে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের মাঝে ক্রমেই এক ধরনের নির্লিপ্ততা প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের এলিট শ্রেণীর প্রধান দুর্বল দিকটি গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স বলে বদরুল আলম খান এক লেখায় উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশের এলিটদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সমঝোতার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য ‘কখনো সমঝোতা কখনো প্রতিযোগিতা’ সংস্কৃতির অনুপস্থিতি মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত না হলে সেই দেশে কর্তৃত্ববাদী নেতা গড়ে ওঠে। কর্তৃত্ববাদী নেতার কাছে জনমতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা তেমন গুরুত্ব পায় না। অন্যদিকে বর্তমান পৃথিবীর রাজনীতি উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো এলিটদের ওপর নির্ভরশীল। এলিটদের পাল্লা ভারী করে রাজনৈতিক নীতিমালা গৃহীত হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী নেতারা চান ব্যবসায়ী, শিল্পপতি আর আমলা তথা এলিটদের তুষ্ট করে ক্ষমতায় থাকতে। এলিট শ্রেণীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর বাংলাদেশে গণতন্ত্র চলে যাওয়ায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক অধিকার থেকে দেশের জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে।
নিয়ামত আলী: ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী, যুক্তরাষ্ট্র










