দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ২০১০ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এক যুগেও বেজার অধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব হয়নি। এজন্য দেশী বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সমস্যাসহ ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করতে না পারাকে দায়ী করছেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে পরিকল্পিত ও বিশেষায়িত শিল্প অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল সরকার।
বেজাকে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয় এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্য থেকে। এজন্য ২০১০ সালে একটি আইন প্রণয়ন হয়। এ আইনের ভিত্তিতে সে বছরের নভেম্বরে যাত্রা করে বেজা। শুরু থেকেই সংস্থাটিকে নানা বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সীমিতসংখ্যক কর্মী বাহিনী নিয়ে ২০১৫ সালে সংস্থাটি সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম শুরু করে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় দেশী বিনিয়োগকারীরা সাড়া দিলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৪৫ লাখ ডলার (সর্বশেষ বিনিময় হার অনুযায়ী ৪৯ কোটি টাকার কিছু বেশি)। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদেশী বিনিয়োগ না আসার বড় কারণ হিসেবে ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করতে না পারাকে দায়ী করছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিতে বেজার বেশকিছু প্রকল্প সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করা যাবে।
পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ, কর্মসংস্থান ও শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তবে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় বিপুল পরিমাণ প্রস্তাবিত বিনিয়োগ হলেও প্রকৃত বিনিয়োগ এসেছে খুবই নগণ্য। মূলত অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি ও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশের ঘাটতির কারণে প্রকৃত বিনিয়োগ কম বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এর পরও সামনের দিনগুলোয় অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগের মাত্রা বাড়বে বলে বেজাসংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন। এছাড়া জাপান, ভারত ও চীনের জন্য পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রমও কমবেশি এগিয়েছে বলে জানা গেছে। সার্বিকভাবে দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর অগ্রগতি নিয়ে বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষ রয়েছে। তাদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে। উদ্যোক্তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। ফলে বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নে তারা পিছিয়ে পড়ছেন।
দেশের অর্থনীতির গতিশীলতার স্বার্থে এমন দৃশ্যপটের পরিবর্তন হওয়া উচিত। এছাড়া বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ধীরগতিতে স্থাপন হচ্ছে। সরকার এখন পর্যন্ত ৯৭টি জোনের অনুমোদন দিয়েছে, যদিও এর মধ্যে পুরোপুরি চালু হওয়া বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) সংখ্যা খুবই কম। প্রস্তাবিত অঞ্চলগুলোর বেশির ভাগই সম্ভাব্যতা যাচাই, জমি অধিগ্রহণ ও অঞ্চলভিত্তিক সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব চিহ্নিত করার পর্যায়ে রয়েছে। অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে জমিস্বল্পতা ও জটিল জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া। এসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সফল ও কার্যকর হিসেবে প্রতীয়মান করতে হবে। তাহলে এসব অঞ্চলকে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সামনে বিনিয়োগ গন্তব্যে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরা সম্ভব হতো। এছাড়া ট্যাক্স সুবিধা, ফিসক্যাল পলিসি, পরিষেবা মূল্য ও পানিসংক্রান্ত নীতির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল পুরোপুরি প্রস্তুত করে এ নিয়ে যথাযথভাবে প্রচার করে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে হবে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসবে এ প্রত্যাশা করা যায়। অন্যদিকে সব জোনেরই বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অবকাঠামো। রিলায়েবল পাওয়ার, গ্যাস ও ভালো কানেক্টিভিটির অভাবে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন না। যতগুলো জোন করা হচ্ছে তার অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। অনেকগুলোয়ই জমিসংক্রান্ত ঝামেলা রয়েছে। এজন্য সরকারি প্রক্রিয়ায় ইকোনমিক জোনকে ভিন্নমাত্রায় দেখা প্রয়োজন। বিনিয়োগের পরিবেশ যেন বহাল থাকে সেটি খেয়াল রাখতে হবে।
ভবিষ্যতে সরকারের ১০০ এসইজেড বাস্তবায়নের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে সীমিত ভূমির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এছাড়া লক্ষ্যভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণের কারণে উৎপাদনশীলতাও বাড়বে। পাশাপাশি কমপ্লায়েন্স মানও অর্জন হবে। বস্তুত একটি কারখানা গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগে। তার পরও বিদেশী বিনিয়োগ যতটুকু এসেছে, তা উল্লেখযোগ্য বটে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকর করার জন্য আরো বেশি পরিমাণে বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল। এজন্য যেসব প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে তা মোকাবেলা করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, নিকট ভবিষ্যতে এসইজেডগুলোর শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে। এজন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় অবকাঠামোগত সমস্যাসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।










