বাঘ জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাণিকুলে ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাঘের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বিশ্বে আশঙ্কাজনকভাবে বাঘ কমে যাচ্ছে। শত বছর আগেও বিশ্বে এক লাখের মতো বাঘের বসবাস ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বনাঞ্চল ধ্বংস, কালোবাজারি ও চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যে বাঘ হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে এ সংখ্যা কমছে। বাঘ সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করতে ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বিশ্ব বাঘ দিবসের সূচনা হয়। বাঘ রয়েছে এমন ১৩টি দেশে প্রতি বছরের ২৯ জুলাই ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ পালন করা হয়ে থাকে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, প্রকৃতিতে বিপন্ন বাঘের অবৈধ চোরাচালান ও পাচারের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বন বিভাগসহ দেশী-বিদেশী সংস্থার অনুসন্ধানে জানা যায়, বাঘ সংরক্ষণে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বসবাসরত অভিজাত গোষ্ঠী চোরাচালানকৃত বাঘ ও এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হয়ে উঠেছে।
এ বছরের বাঘ দিবস উপলক্ষে কনজার্ভেশন সায়েন্স অ্যান্ড প্র্যাকটিস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে বাঘ ও বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে তৈরি পণ্য এখন ১৪টি দেশে যায়। এর মধ্যে জি২০ভুক্ত দেশগুলোও রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও কাতারে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের মধ্যে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্রেতা পাওয়া গেছে। তবে সার্বিকভাবে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বিত্তশালী বাংলাদেশীরাই। আর এসব ক্রেতার চাহিদা পূরণে উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে বাঘ শিকার করা হচ্ছে।
এভাবেই বাঘ হচ্ছে বিপন্ন, প্রকৃতি হারাচ্ছে তার জীববৈচিত্র্য। যে কারণে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি বাঘ শিকারিদের। বিত্তশালী গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে সৃষ্টি হয়েছে বিষ দিয়ে বাঘ শিকারকারী সিন্ডিকেট।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৩৫০টি। ১৯৮২ সালের জরিপে দেখা যায় বাঘের সংখ্যা ৪২৫টি। ১৯৮৪ সালে সুন্দরবনের ১১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি বাঘ থাকার কথা জানানো হয়। ২০১৮ সালে করা একটি জরিপের ফলাফলে বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে ১১৪টি। এভাবে ধারাবাহিকভাবে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়া মোটেও ইতিবাচক কোনো লক্ষণ নয়।
অন্যদিকে প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা বিভিন্ন সময়ে সুন্দরবনে বাঘের মৃত্যুর জন্য নয়টি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস), লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়া, মিঠাপানির অভাব, খাদ্য সংকট, বন ধ্বংস, বাঘের আবাসস্থলের অভাব, চোরা শিকারি, অপরিকল্পিত পর্যটন ও বনের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, সুন্দরবন এশিয়ার মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বৃহত্তম আবাসভূমি। কিন্তু বন বিভাগ এ আবাসভূমিকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে পারেনি। সুন্দরবনকে বন্যপ্রাণীদের জন্য নিরাপদ করা গেলে বাঘের সংখ্যা আরো বাড়বে। বাঘ রক্ষায় আবাসস্থল সংরক্ষণ, বনের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের বিকাশ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করাসহ নানা সুপারিশ করেছেন। সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, আশঙ্কাজনক হারে সুন্দরবনে বাঘ কমেছে। এটা বাঘের জন্য এক ধরনের হুমকি। তবে বাঘ ও সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষায় সরকার সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ বনভূমিকে অভয়াশ্রম ও সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের যে শর্ত, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বাঘের প্রজনন বাড়বে। প্রজনন বাড়লে বাঘও বাড়বে।
বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সুন্দরবনে বাঘ বৃদ্ধির জন্য তিনটি বিষয় জরুরি। ভালো আবাসস্থল, ভালো খাবারের পাশাপাশি চোরা শিকারিদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে সুন্দরবনকে বাঘ শিকারের জন্য গ্রাউন্ড জিরো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিকার এখনো বাঘের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এ বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সবার অবশ্যই মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। কেননা বাংলাদেশে অবৈধভাবে বাঘ পাচারের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাঘের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে সুন্দরবনকে তৈরি করার বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে চোরাকারবারিদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এমনকি যেসব বিত্তশালী ক্রেতার কাছে বাঘের চামড়া বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি হচ্ছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। বাঘ যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ রেখে বনাঞ্চলে বাঘের সাবলীল বিচরণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাঘ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বন বিভাগের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনে বাঘ গণনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, এটি সফলভাবে শেষ করা হোক। বাঘের নিরাপত্তা, বিশ্রাম ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশ সীমিত করতে হবে এবং বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রোলিং বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাঘ সংরক্ষণে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এজন্য পর্যটক ও সুন্দরবনে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। বাঘের স্বাভাবিক পদচারণায় সুন্দরবন মুখরিত থাকুক, আমরা সেটিই প্রত্যাশা করি। এ পরিপ্রেক্ষিতে বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হোক।










