বাংলাদেশের যেকোনো মানুষকে নদী বিষয়ে কয়েক লাইন বলতে বললে আশা করা যায় তারা অনায়াসে কিছু না কিছু বলতে পারবে। কেননা এ দেশের সর্বত্র জালের মতো বিছিয়ে আছে নদী। এসব নদনদীর অধিকাংশই মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে নদীর প্রতি এক ধরনের আবেগ পরিলক্ষিত হয় মানুষের মাঝে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় মরুভূমি কী? সবার চোখে ভেসে উঠবে কেবল বালিময় ধু-ধু প্রান্তর। কারণ দূর-দূর পর্যন্ত এ দেশের মানুষের যোগসাজশ নেই মরুভূমির সঙ্গে। অথচ নদী ও মরুভূমি—দুই বাংলা ভাষায় প্রচলিত শব্দ। পার্থক্যটা শব্দদ্বয়ের অভিব্যক্তিতে, পার্থক্যটা সংস্কৃতিতে। যে সংস্কৃতি বলে বাংলাদেশের মানুষ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি।’ সুতরাং ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, মনের ভাব প্রকাশের বাহনও নয়। এর সঙ্গে জড়িত সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনীতিও। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) বাংলা ভাষার রাজনৈতিক অধিকার আদায় করলেও আজ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, বরং ভাষা চর্চা ও ভাষার ব্যবহারে চলছে দেশব্যাপী উদাসনীতা। বাংলা ভাষাকে কেবল রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে কিন্তু বাস্তবিক প্রয়োগের দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।
বাংলা ভাষার বেহাল দশা প্রসঙ্গ উঠলেই আপামর মানুষ দোষ চাপিয়ে দেয় ইংরেজি ভাষার ওপর। অবশ্য এ অভিযোগ পুরোপুরি নাকচও করা যায় না। তবু আমাদের মনে রাখা দরকার ব্রিটিশ আমল থেকেই ইংরেজি ভাষায় শিক্ষার প্রচলন ছিল। কিন্তু সমস্যাটা যত না ভাষার, তত বেশি ভাষা চর্চার। ইংরেজি ভাষা প্রচলন আজকে বন্ধ করে দিলেও লাভ হবে না, যদি বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চা ত্বরান্বিত করা না যায়। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের সর্বত্র প্রচলন ইংরেজি ভাষার। বাংলাকে এ শিক্ষার বাহন করতে প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে বাংলায় রচিত পাঠ্য বইয়ের। প্রয়োজন ছিল বিদেশী বইয়ের সুপাঠ্য অনুবাদ। কিন্তু সুপাঠ্য দূরের কথা, উল্লেখযোগ্য ও পর্যাপ্ত অনুবাদকর্ম নেই। পাঠ্যবই তৈরি ও অনুবাদ করতে প্রয়োজন ইংরেজি ও বাংলা ভাষা দক্ষতা এবং এর নিবিড় চর্চা। কারণ অনুবাদ করার আগে অনুবাদকারীর তা বোঝা দরকার। আবার যারা বুঝতে সমর্থ তারা বাংলায় তা প্রকাশ করতে ব্যর্থ। ফলে বলা যায় প্রয়োজনীয় ভাষাজ্ঞান ও চর্চার অভাবে বাংলাকে উচ্চ শিক্ষার বাহন করা সম্ভব হয়নি। এ দায় দেশের বিজ্ঞদের ওপর যতটা বর্তায় ততটা বর্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর ওপরও। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকাশনা সংস্থা এ বিষয়ে বেশ সক্রিয় কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা সংস্থাগুলোর নেই কোনো নড়চড়। এক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির অবদানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।
এ তো গেল উচ্চ শিক্ষার প্রসঙ্গ। প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে দায়টা কার ওপরে দেয়া যায়? বর্তমানে কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয় এবং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অভিভাবকদের ঝোঁক ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানকে পড়ানোর দিকে। বাচ্চাদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলা, ইংরেজি কার্টুন দেখানো এখন প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তান বড় হয়ে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বেশি প্রয়োজনীয় ভেবে ছোট থেকেই তাদের ইংরেজিমুখী করে তোলা হচ্ছে আর বাংলাবিমুখ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পর্যালোচনা বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা খুব একটা ভালো নয়। জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলায় গড় দক্ষতা মান ১০৩ দশমিক ৩। এর পেছনে অভিভাবকের যুক্তি, চাকরির বাজারে ইংরেজি ভাষায় পটু প্রার্থীর চাহিদা বেশি। এছাড়া ইংরেজি জানলে চাকরিভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে। তাই তাদের গুরুত্ব সন্তানের ইংরেজি ভাষা শিক্ষার পেছনে। অবশ্য তাদের ধারণাকে হেসে উড়িয়ে দেয়া যায় না, এটি আরেকটি ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে।
অধিকাংশ দপ্তরের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি। এমনকি দেশের উচ্চ আদালতেও বিচারের রায় দেয়ার মাধ্যম ইংরেজি। ফলে কেবল সংস্কৃতি ধ্বংস হচ্ছে তা নয়, বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। ইংরেজি ভাষার লেবাস জড়িয়ে প্রার্থীরা চাকরি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে। দেখা যাবে তাদের অনেকেই দাপ্তরিক কাজে দক্ষ নয়। আবার প্রকৃত দক্ষরা পিছিয়ে যাচ্ছে ইংরেজিতে কথা বলতে না পারার ফলে কিংবা ইংরেজিতে লেটার অব ইনটেনশনটা ঠিকমতো লিখতে না পারায়। কেবল ইংরেজিতে পারদর্শী একজন যেমন কাজ করতে করতে কাজ শিখতে পারে, তেমনি কাজে দক্ষ মানুষের ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারত যে সে কাজের পরিসরে ইংরেজিতে পটু হতে পারবে। কিন্তু শিক্ষাজীবন থেকে চাকরি জীবনে প্রবেশের ভাষাগত অসম সেতুটাই পাড়ি দেয়া হয়ে ওঠে না অনেকের। ফলে তারা কেবল সরকারি চাকরির পেছনে দৌড়াচ্ছে। নির্দিষ্ট খাতে কর্মসংস্থানের চাপ বাড়ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য তা মোটেও সুখকর নয়।
অন্যদিকে বাংলা ভাষার মাধ্যমে অর্থনীতি সমৃদ্ধ করা যেত। কীভাবে তা ব্যাখ্যা করতে বা উদাহরণের জন্য সুদূর চীন বা জাপানের কথা বলার দরকার নেই। অনুমান করা যাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে অবস্থিত ব্রিটিশ কাউন্সিলের মতো বাংলা কাউন্সিল তৈরি করা আছে বিভিন্ন দেশে। আজকে ইংরেজি শেখার জন্য যত অর্থ ব্যয় করছে মানুষ, বাংলা ভাষা শিখতে তার একাংশ ব্যয় করলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে দেশ আরো এগিয়ে থাকত বলে আশা করা যায়। বাংলা ভাষাকে কেবল কাগজে কলমে রাষ্ট্রভাষা করে না রেখে যদি চীন, জাপানের মতো দপ্তরের ভাষা হিসেবে চালু ও প্রতিষ্ঠিত করা যেত তাহলে দেশের মানুষ বাংলা চর্চায় মনোযোগী হতো। একই সঙ্গে বিদেশীদেরও এ ভাষা শেখানোর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার সুযোগ ছিল। ভুলে গেলে চলবে না বহুল ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে বাংলার অবস্থান সপ্তম আর মাতৃভাষা হিসেবে এর অবস্থান পঞ্চম। এছাড়া ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বাংলায় কথা বলে ২২ কোটির বেশি মানুষ। সুতরাং পরিকল্পিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে অর্থনীতি ও সংস্কৃতির হাতিয়ার করা যেত।
সংস্কৃতির উপাদানের মধ্যে ভাষা অন্যতম। ভাষার মাধ্যমে একটি জাতি বিশ্বে নিজের ঐতিহ্য তুলে ধরে। ভাষা যদি বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে সংস্কৃতির দ্যোতনা হারিয়ে যাবে। নদীর দ্যোতনা কখনো রিভার শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ভাষা আর সংস্কৃতি তাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রায় ৭১ বছর অতিবাহিত হলেও বাংলা ভাষা দেশের সর্বত্র চালু হয়নি, বরং চর্চায় ও ব্যবহারে ঔদাসীন্য সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ না পেলে দেশের সামগ্রিক উন্নতি কখনো সম্ভব হবে না। নিজের ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত না করে বিদেশী ভাষার প্রচলন করার মতো কঠিন কাজ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তার না হলে দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটবে না। সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি সর্ব ক্ষেত্রেই মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চা বিকাশে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে উদ্যোগী হতে হবে সবাইকে।










