তিলতেল উচ্চ পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ভোজ্যতেল, যাতে রয়েছে বেশকিছু ভিটামিন, যেমন ভিটামিন-ই, বি কমপ্লেক্স ও ডি এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান। হাড়ের ক্ষয় ও অস্টিওপোরোসিস রোধসহ হাড়ের জোড়ায় ব্যথাজনিত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে তিলতেল বেশ কার্যকর। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, তিলতেল রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। তিলতেলে থাকা ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন-ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সহায়ক। তিলবীজে ৪২-৪৫ শতাংশ তেল থাকে, যাতে মানবদেহের অতিপ্রয়োজনীয় ৮০-৮২ শতাংশের বেশি অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে শক্তিশালী রাখতে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। এ তেলের ‘টাইরোসিন’ নামক অ্যামাইনো অ্যাসিড মানসিক অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করতে সহায়ক। তাছাড়া তিলতেল প্রয়োজনীয় এনজাইম ও হরমোন সরবরাহের মাধ্যমে মন-মেজাজও ভালো রাখে।
উল্লিখিত পুষ্টিগুণের কারণে আদিকাল থেকেই তিলতেল ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। তিলতেল চুল পড়া কমায়, চুল পাকা রোধ এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়। অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান থাকায় তিলতেল ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। তিলতেল একটি অসাধারণ ময়েশচারাইজার এবং এতে ডিটক্সিফাইং উপাদান থাকায় ত্বককে নরম ও কোমল রাখে এবং এ তেল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ বিধায় অ্যান্টি-এজিং হিসেবে কাজ করে ও ত্বক কুচকিয়ে যাওয়া প্রতিহত করে।
দেশে সরিষা, তিল এবং সূর্যমুখী হতে প্রাপ্ত ভোজ্যতেল উৎপাদনের পরিমাণ মাত্র তিন লাখ টনের মতো, অর্থাৎ দেশীয় মোট চাহিদার সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসেবে সর্বশেষ অর্থবছরে আমাদের দেশে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার টন পাম তেল এবং ৭ লাখ ৮০ হাজার টন সয়াবিন তেল আমদানি করা হয়েছে এবং এতে ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় ভোজ্যতেলের উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা মেটাতে সরিষার পাশাপাশি তিলের আবাদ এবং উৎপাদনও বাড়াতে হবে।
দানাদার ফসল, ফল ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করতে পারলেও ভোজ্যতেল উৎপাদনের পরিমাণ বিগত বছরগুলোয় ছিল চাহিদার তুলনায় মাত্র ১২ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে কিছুটা বেড়েছে। তাই এখনই সময় তিলসহ অন্যান্য ভোজ্যতেলের উৎপাদনে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা।
দেশে তেলবীজ ফসলের মধ্যে তিলের অবস্থান চতুর্থ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২১-২২ অনুসারে, দেশে গড়ে প্রায় ৩৩ হাজার হেক্টর জমি থেকে তিলের উৎপাদন হয় প্রায় ৩১ হাজার টন। খরিফ-১ এবং রবি উভয় মৌসুমেই তিলের চাষ হলেও দুই-তৃতীয়াংশ আবাদ হয় খরিফ-১ মৌসুমে। খরিফ-১ মৌসুমে পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, রাজশাহী, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, রাঙ্গামাটি এবং এ জেলাগুলোর নিকটবর্তী অঞ্চল তিল চাষের জন্য অধিক উপযোগী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২১-২২ অনুযায়ী ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত তিলের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৯৪৪ কেজি, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি। তিলের জাতীয় গড় ফলন কম হওয়ার মূল কারণগুলো হলো অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড়, ফুল আসা পর্যায়ে শুরুতে বা শেষে অথবা ফলধারণ পর্যায়ে অতিবৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বীজ শোধন, উপযুক্ত পরিচর্যাসহ আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ না হওয়া। আবহাওয়ার বিবেচনায় সঠিক সময়ে সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, উচ্চফলনশীল জাতের গুণগতমানের বীজ ব্যবহার, উপযুক্ত পরিচর্যাসহ আধুনিক চাষাবাদ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে তিলের ফলন হেক্টর প্রতি ১ হাজার ৫০০ কেজি পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব।
উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাতগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি অনেকাংশেই সম্ভব। দেশের উপকূলীয় ও চর এলাকায় তিলসহ সরিষা, বাদাম, সূর্যমুখী ও সয়াবিন এবং পার্বত্য এলাকায় তিল ও সরিষা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সঠিক ও রাস্তবমুখী পরিকল্পনার পাশাপাশি সমম্বিত উদ্যোগ।
ড. মো. আব্দুল মালেক: মহাব্যবস্থাপক, সমন্বিত কৃষি ইউনিট, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)










