পানি যা ছাড়া মানুষের জীবন অচল কিন্তু সেই পানিই যখন প্রতিদিনের দুর্ভোগের নাম হয়ে ওঠে, তখন গ্রামীণ জীবনের চিত্র হয়ে ওঠে অনেক বেশি ভারী আর ক্লান্তির নতুন নাম। শহরে ট্যাপ ঘুরালেই পানি মেলে কিন্তু উপকূলে এক কলসি পানির জন্য হাঁটতে হয় ৩ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। শরণখোলার অনেক পরিবার এখনো পুকুরের পানি খেয়ে বেঁচে আছেন।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বগী, পূর্ব খুড়িয়াখালি এবং চালিতাবুনিয়া গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে এমনই বাস্তবতা ছিল। এই অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির একমাত্র ভরসা ছিল পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ), যা বছরের পর বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ফলস্বরূপ গ্রামবাসী তীব্র পানিসঙ্কটে ভুগছিলেন। কারও সকাল শুরু হতো কলসি কাঁধে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে, আবার কেউ বাধ্য হয়ে নদী-নালা এবং পুকুরের ঘোলা পানিকে ফিটকিরি দিয়ে ছেঁকে ব্যবহার করতেন। এর ফলে শিশুরা ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগে ভুগত। পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বেড়েই যাচ্ছিল।
এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে এগিয়ে এলো লাল সবুজ সোসাইটি। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি বোঝেন এবং পিএসএফ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয় 'সেফ ওয়াটার ফর অল'।

৮ আগস্ট ২০২৫, বগী গ্রামের এক উঠোনে নারী, পুরুষ, শিশু আর বৃদ্ধের ভিড় জমেছিল এক উৎসবের আবহে। এই উঠান বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বহুল প্রতীক্ষিত নিরাপদ পানি। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে, 'সেফ ওয়াটার ফর অল' প্রজেক্টের মাধ্যমে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সহযোগিতায় লাল সবুজ সোসাইটি এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেয়। গ্রামের পুরনো পিএসএফগুলো (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) সংস্কার করা হয়, যা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে আসে।
বগী গ্রামের গৃহবধূ আছিয়া খাতুন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, 'আমাগো খুব কষ্ট হইতো আগে। পুকুর থেইকা পানি আনতে হইতো... এখন আর ওই কষ্ট নাই। লাল সবুজ সোসাইটি আমাগো জীবন অনেক সহজ কইরা।' ফিল্টার সচল হওয়ার পর গ্রামের উঠোনে যেন এক উৎসবের আমেজ দেখা যায়। শিশুরা আনন্দে গ্লাসে ভরে বিশুদ্ধ পানি পান করতে থাকে।

পরদিন লাল সবুজ সোসাইটির প্রতিনিধি দল পৌঁছায় পূর্ব খুড়িয়াখালি গ্রামে। সেখানকার বাসিন্দা রুখসানা বেগম জানান, 'আমরাই বেশি ভুগতাম পানির জন্য। ভোরে উঠেই হাঁড়ি নিয়ে দুই-তিন কিলোমিটার হেঁইটে পানি আনতে হইতো।' শুধু খুড়িয়াখালি নয়, চালিতাবুনিয়া গ্রামের মানুষও এখন এই বিশুদ্ধ পানির সুবিধা পাচ্ছেন। এই জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমটি এখনও জোর কদমে চলমান রয়েছে, যা উপকূলীয় জীবনে স্বস্তির এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে।
লাল সবুজ সোসাইটির ক্লাইমেট একশন ফোকাল আল মামুন রাকিব বলেন, এই উদ্যোগে ইতিমধ্যে ৫টি পিএসএফ সংস্কার ও একটি নতুন পিএসএফ নির্মাণ করা হয়েছে। "আগামী দিনে আমাদের পরিকল্পনা হলো শতাধিক পিএসএফ সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করা। এতে উপকূলের অন্তত ১০,০০০ মানুষ নিরাপদ পানির সুযোগ পাবেন।" উপকূলের মানুষের জীবনে স্বস্তি আর শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে 'ওয়াটার ফর অল' এক উজ্জ্বল আশার আলো।










