ইউরোপীয় পর্যটকদের কাছে উসমানি সাম্রাজ্য ছিল রহস্যময় দুনিয়া। সেখানকার সাংস্কৃতিক বহুত্ব ও বৈচিত্র্য উপভোগ করতে লোক আসতো ইতালি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স থেকে। পরবর্তীতে সে অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণও করেছেন অনেকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে। ফুটে উঠেছে ঈদ পালনের ঐতিহ্য। ঈদ কতোটা রঙিন ও আনন্দঘন ছিল তখন, তা যেন স্পষ্টভাবে হাজির হয় চোখের সামনে।
চার্লস হোয়াইট ইংরেজ সামরিক কর্মকর্তা। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে তিনি তুরস্কে বসবাস করেন সামরিক প্রয়োজনে। ১৮৪৪ সালে প্রকাশিত হয় তিন খণ্ডে লিখিত তার গ্রন্থ ‘থ্রি ইয়ার্স ইন কনস্টান্টিনেপোল’। বইটিতে তিনি ইস্তানবুলে উদযাপিত ঈদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন নিপুণভাবে। তার ভাষ্য, ‘বিশেষ ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে পালিত হয় ঈদ। চারদিক থাকে উৎসবমুখর। দিনটিতে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে পরস্পরের সঙ্গে দেখা করে ও হাত মেলায়। তুর্কিদের এই সংস্কৃতি ইংরেজরা গ্রহণ করতে পারে।’
ফরাসি পর্যটক ও লেখক ফ্রান্সিস হার্ভে জন্মগ্রহণ করেন ১৭৮১ সালে। ঊনিশ শতকের প্রথম ভাগে তিনিও ইস্তানবুল সফর করেন। সে অভিজ্ঞতা তিনি লিখে রেখে গেছেন দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘আ রেসিডেন্স ইন গ্রিস অ্যান্ড টার্কি’ পুস্তকে। ঈদ সম্পর্কে তার বক্তব্য, ‘এখানে ঈদ আসে আনন্দ ও উৎসব নিয়ে। ছুটির দিনে সবাই নতুন কাপড়-চোপড় পরিধান করে। দল বেধে বের হয় বিভিন্ন স্থানে। বাইরে থেকে আসা কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারে, তাদের সজ্জাটা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, নৌকায় বসে থাকা সুসজ্জিত তুর্কি পরিবারের চেয়ে মনোমুগ্ধকর আর কিছু নেই।’

মার্কিন মিশনারি হেনরি ওটিস ডোয়াইট ইস্তানবুলে এসেছিলেন ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি। তিনি লিখেছেন, ‘ঈদের উৎসবে শিশু-কিশোররা নতুন জামা পরে। ছেলেদের দেখতে লাগে মেজর জেনারেলদের পোশাকে। মেয়েরাও সাজে রঙ বেরঙের পোশাকে। রাস্তার পাশে দোকান থেকে চলে কেনাকাটা। চারদিক তখন মুখর থাকে। শিশুদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয়, ঈদের উৎসব যতটা না বড়দের জন্য, তার চেয়ে বেশি শিশুদের জন্য।’
ঈদের দিন সকালে খলিফার নির্দেশে প্যারেড বের হতো। ব্রিটিশ লেখক আনা ব্রাসি (১৮৩৯-১৮৮৭) উসমানি দরবারের সেই ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দিচ্ছেন তার লেখা ‘সানশাইন অ্যান্ড স্টর্ম ইন দ্য ইস্ট অর ক্রুজ টু সাইপ্রাস অ্যান্ড কনস্টান্টিনেপোল’ বইয়ে। তিনি বলেছেন, ‘তুর্কি রমণীরা সেজে উঠেছে বিচিত্র সব রঙে। তাদের গায়ে লাল, হলুদ, সবুজ ও নীল জামা। তাদের সঙ্গে থাকা ভৃত্য ও পরিচারিকারাও বাদ যায়নি।’
ঈদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আরেক লেখক ক্যারোলিন পেইনও। ১৮৫৯ সালে তার প্রকাশিত বই ‘টেন্ট অ্যান্ড হারেম: নোটস অব অ্যান ওরিয়েন্টাল ট্রিপ’ বইয়ে তিনি ঈদের দিন সকালে হওয়া মিছিল সম্পর্কে খুটিনাটি তুলে এনেছেন। এছাড়া ক্লারা এরস্কাইন (১৮৩৪-১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ) তুলে ধরেছেন তার ঈদ অভিজ্ঞতা। লেখক আলেকজান্ডার মিলিনগেনও (১৮৪০-১৯১৫) দীর্ঘদিন ব্যয় করেছেন ইস্তানবুলে। সেখানে তিনি ঈদ ও রমজান—দুটিই উপভোগ করেছেন। তার ভাষায়, ‘ভিক্ষুকরা ঈদের দিন বড়লোকের দুয়ারে আসে তাদের গোশত ও খাবারের একটা অংশ নিয়ে যাওয়ার জন্য। এর বাইরে তাদের হাতে পয়সা ও নতুন জামাকাপড়ও তুলে দেয়া হয়।’

হ্যারিসন গ্রিসউল্ড ডোয়াইট তার লেখা বই ‘কনস্টান্টিনেপোল: ওল্ড অ্যান্ড নিউ’ পুস্তকে লিখেন, ‘উসমানি সাম্রাজ্য ঈদের দিন থাকে উৎসবমুখর। এ সময়ে পরস্পর পরস্পরকে ঈদ উপহার দেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেন যাকাত ও সদকা। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বাসায় ঘুরতে যান। এই দিন যদি কাউকে বাড়িতে পাওয়া যায়, সেটা বেশ আশ্চর্যকর ঘটনাই হবে।’
উসমানি আমলে ঈদ পালিত হতো উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে। রাজকীয়ভাবে আয়োজিত হতো মিছিল। অধস্তন ও গরিবদের জন্য থাকতো বিশেষ উপহার। ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষ একে অপরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতো। শিশু-কিশোর ও নারীরাও সেজে উঠতো বাহারি পোশাকে। মুসলিম বিশ্বে ঈদ পালনের যে ঐতিহ্য, তা তারা নিয়ে গিয়েছিল অন্য উচ্চতায়।
সূত্র: দ্য ডেইলি সাবাহ










