ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্মের
একটি চিকেনকারি। শতাব্দির পর শতাব্দি পেরিয়ে এ শিল্প প্রবল প্রতাপে টিকে আছে। আজকাল
লখনৌ অঞ্চলের সঙ্গে এর নামডাক বেশি হলেও পৃষ্টপোষকতার দিক থেকে দিল্লির নাম আসে আগে।
চিকেনকারি এখন স্রেফ সুচিকর্মের একটি
ধরন নয়। এই সূক্ষ্ম কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দি আগের ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের
ইতিহাস। চিকেনকারি প্রবর্তনের কৃতিত্ব নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেয়া হয় না হলেও এর
প্রচার ও জনপ্রিয়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন রাণী, রাজকন্যা ও অভিজাত সম্প্রদায়ের
নারীরা।
চিকেনকারির ইতিহাস সম্পর্কে পর্যালোচনা
করলে ভারতের বিখ্যাত এক সম্রাজ্ঞীর নাম আগে আসে। তিনি হলেন মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান।
সম্রাট আকবরের ছেলে সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী।
নূরজাহানের জন্ম ১৫৭৭ সালে। তার বাবা গিয়াস বেগ নাম রেখেছিলেন মেহের-উন-নিসা। বিয়ের পর সম্রাট জাহাঙ্গীর নাম দেন নুরজাহান। নিজের সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও মুঘল দরবারে প্রভাবের জন্য বিখ্যাত ছিলেন এ নারী। ভারতীয় সংস্কৃতির এ পৃষ্ঠপোষক মুঘল ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছেন।
ছবি: ফ্যাশন সাজেস্ট
চারুকলা ও কারুশিল্পের প্রতি নুরজাহানের
ছিল আকর্ষণ। শৈল্পিক ও সৌন্দর্য বিষয়ে তার ছিল গভীর উপলব্ধি। এ কারণে নানা ধরনের শিল্পের
প্রসারে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখার সম্ভব হয়েছিল। তার সময়ে মুঘল দরবার ছিল শৈল্পিক ও সাংস্কৃতিক
বিনিময়ের কেন্দ্রস্থল। যেখানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের কারিগররা জড়ো হতেন। তাদের হাতে
তৈরি হতো আকর্ষণীয় সব শিল্পকর্ম।
সূচিকর্মের প্রতি নুরজাহানের ছিল ভীষণ
ভালোবাসা। আর তিনিই চিকেনকারিকে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে বিকশিত হতে সাহায্য করেন।
চিকেনকারি হলো কাপড়ের ওপর এক ধরনের সূক্ষ্ম ও শুভ্র সুতার কাজ। এ নকশায় সাদা বা প্যাস্টেল শেডের সুতা ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের ফুল ও জ্যামিতিক ডিজাইন এই সূচিকর্মের সাহায্যে কাপড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। ব্যাকস্টিচ, চেইন স্টিচ ও সাটিন- নানা ধরনের সেলাই রয়েছে চিকেনকারিতে।
ছবি: ওয়েডিং ওয়ার
ফারসি ভাষায় ‘সূচিকর্ম’ বোঝাতে ‘চিকেন’
শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকে এসেছে চিকেনকারি। যুগে যুগে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে
ফুটে উঠেছে পোশাকে।
বলাবাহুল্য যে নূরজাহানের পোশাকে চিকেনকারির
কাজ থাকত। তার রাজকীয় পোশাকে এই সূচিকর্মের ব্যবহার ছিল অনেক সূক্ষ্ম। সম্রাজ্ঞীর দেখাদেখি
অন্যরাও তাকে অনুসরণের চেষ্টা করত। এভাবে চিকেনকারি জনপ্রিয়তা লাভ করে আর হয়ে উঠে বিলাসিতার
প্রতীক। যার ফলশ্রুতিতে কারিগরদের জন্য লাভজনক হয়ে উঠে।
উত্তরাধিকার সূত্রে শতাব্দির পর শতাব্দি
চিকনকারি বিকাশ লাভ করতে থাকে। কারিগররা নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে তা পরের প্রজন্মের
মাঝে ছড়িয়ে দেন। বর্তমানে সারা বিশ্বের ফ্যাশন ডিজাইনারদের অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে চিকনকারির
সূক্ষ্ম সৌন্দর্য।
চিকেনকারি এখন শুধু সূচিকর্মের ধরন নয়। বিস্তৃত সাংস্কৃতিক প্রভাব, শৈল্পিক আদান-প্রদান ও শতাব্দী ধরে অগণিত দক্ষ কারিগরদের অবদান এর প্রতিটি নকশায় দৃশ্যমান। তেমনি দৃশ্যমান সমঝদারদের অবদান। যেভাবে স্মরণ করা হয় নূরজাহানকে।
টাইম অব ইন্ডিয়া অনুসরণে










