আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন প্রায় প্রতিটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আমাদের জীবনকে সহজ করছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে — হাতের কাছে পাওয়া সুবিধা কি আমাদের ‘চিন্তা করার ক্ষমতা’ কমিয়ে দিচ্ছে?

সাম্প্রতিক এক গবেষণা এ বিষয়ে আরো ভাবতে বাধ্য করছে। মানুষের মস্তিষ্কের কাজকর্ম নিয়ে গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষক নাটালিয়া কোসমিনা। তিনি সম্প্রতি দেখেছেন, ক্রমাগত চ্যাটজিপিটির ব্যবহার মানুষের মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে।

তার গবেষণায় শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ লিখতে দেয়া হয়। সেখানে—কেউ নিজে, কেউ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, আর কেউ চ্যাটজিপিটি দিয়ে প্রবদ্ধটি লিখে। দেখা যায় এ কাজে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এআই ব্যবহার করেছে, তাদের মস্তিষ্কে চিন্তা ও মনোযোগের কার্যকলাপ অনেক কম।

আরো অবাক করা বিষয় হলো— লেখা শেষে এআই ব্যবহারকারীরা কেউ বলতে পারেনি, কী লিখেছে। এ বিষয়ে কোসমিনা বলেন, আমাদের মস্তিষ্ক শর্টকাট ভালোবাসে, কিন্তু শেখার জন্য কষ্ট করা দরকার। সহজ পথে চললে মস্তিষ্ক শেখা বন্ধ করে দেয়।

সহজ জীবনের ফাঁদ

আমরা এখন এমন এক ‘ফ্রিকশনলেস’ বা বাধাহীন জীবনে অভ্যস্ত, যেখানে সবকিছু এক টাচেই মেলে—গুগল, নেভিগেশন, ক্যালকুলেটর, অনলাইন অর্ডার। ফলাফলে, আমরা ভাবার, মনে রাখার, এমনকি কথা বলার সময়ও ফোনের সাহায্য নিতে চাই।

ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ডেইজি ক্রিস্টোডুলু সাম্প্রতিক সময়কে ‘স্টুপিডোজেনিক সোসাইটি’— বা বোকা হয়ে যাওয়ার সমাজ বলে অভিহিত করেছেন। যেখানে প্রযুক্তি আমাদের হয়ে সব কিছু করছে আর আমরা চিন্তা করা ভুলে যাচ্ছি।

‘ব্রেন রট’: যখন ফোন আমাদের মনোযোগ খেয়ে ফেলে

২০২৪ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে সবচেয়ে সেরা শব্দ নির্বাচিত হয়েছে ‘ব্রেন রট’। এর মানে— অতিরিক্ত সময় ফোনে কাটিয়ে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া। প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচানোর কথা বলেছিল, কিন্তু আসলে আমাদের সময় আর মনোযোগ দুই-ই কাড়ছে।

আমরা হাতে রাখি এমন একটি ডিভাইস, যেখানে পৃথিবীর সব জ্ঞান আছে। কিন্তু আমরা তবুও ঘন্টার পর ঘন্টা দেখি অর্থহীন ভিডিও, মিম, শর্টস। কারণ এগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে আমরা থামতে না পারি।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ লিন্ডা স্টোন বলেন, মানুষ এখন সারাক্ষণ কন্টিউনিয়াস পার্সিয়াল অ্যাটেনশান অবস্থায় থাকে—মানে, সবকিছুর দিকে একটু একটু মনোযোগ, কিন্তু কোথাও সম্পূর্ণ মনোযোগ নেই। মনোযোগ এমন টুকরো টুকরো ভাগ হয়ে যাওয়ায় আমরা প্রতিনিয়নত ক্লান্ত, ভুলোমনা ও উদ্বেগে ভুগছি।

আমাদের হয়ে চিন্তা করছে এআই

আগে প্রযুক্তি আমাদের কাজে সাহায্য করত। এখন এআই আমাদের হয়ে ভাবছে, লিখছে, পরিকল্পনা করছে। সুইস গবেষক মাইকেল গারলিখ দেখেছেন, যারা বেশি এআই ব্যবহার করে, তাদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা কম। তার ভাষায়, ‘এআই হয়তো মোমবাতিকে আরো সুন্দর করতে পারে, কিন্তু বাতি আবিষ্কার করতে পারে না।’ অর্থাৎ, নতুন ধারণা আসবে মানুষের মাথা থেকে, যন্ত্রের নয়।

শিক্ষাও এখন যন্ত্রের হাতে

ব্রিটেনে এক জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছে। অনেকে সরাসরি এআই দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট লিখিয়ে নিচ্ছে।

শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা এখন উত্তর পেয়ে যায়, কিন্তু বোঝে না। ফলে তাদের গভীরভাবে চিন্তা বা বিশ্লেষণ করার অভ্যাস নষ্ট হচ্ছে। আর এ অভ্যাসের ফলে তারা সহজেই ভুয়া তথ্যেও বিশ্বাস করে ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষক ম্যাট মাইলস বলেন, ‘আজকের শিক্ষার্থীরা জানে কীভাবে গুগলে খুঁজতে হয়, কিন্তু তারা জানে না কীভাবে ভাবতে হয়। সব উত্তর জানা মানেই জ্ঞানী হওয়া নয়’।