ভাষার মাধ্যমে ভাবের প্রকাশ, যোগাযোগ ও সহযোগিতার সক্ষমতায় মানুষ অন্য প্রাণীর চেয়ে অনন্য। কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রজাতি নয় যারা শব্দের সঙ্গে অর্থ জুড়ে দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু পাখি, শিম্পাঞ্জি, ডলফিন ও হাতিরও রয়েছে নিজস্ব শব্দভান্ডার। তবে এ ক্ষমতা কীভাবে বিকশিত হলো, তা এখনো রহস্য।
নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন পত্রিকায় প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, পৃথিবীর নানা প্রজাতির পাখি এক অভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে শত্রুর আগমন সম্পর্কে সতর্ক সংকেত দেয়।
অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত থেকে শুরু করে আফ্রিকা পর্যন্ত পৃথিবীর নানা জায়গায় অন্তত ২০টিরও বেশি পাখি প্রজাতি আছে, যাদের বিবর্তনীয় দূরত্ব ৫ কোটি বছরেরও বেশি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোকিল বা অন্য কোনো পরজীবী পাখি (যে অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়ে) দেখলে এরা সবাই একই রকম শব্দে ডাকতে শুরু করে।
অস্ট্রেলিয়ায় গবেষকেরা দেখেছেন, ‘সুপার্ব ফেয়ারি-রেন’ নামের ছোট পাখিটি কোকিল দেখলেই একটি বিশেষ ডাক দেয়। এই ডাকে আশেপাশের অন্যান্য ফেয়ারি-রেনরা এসে কোকিলের ওপর আক্রমণ চালায়।
গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, শুধু ফেয়ারি-রেনই নয়—অন্য প্রজাতির পাখিরাও একই ধরনের ডাক দেয়, এবং শুধুমাত্র কোকিল দেখলেই তা করে। আশ্চর্যজনকভাবে, চীন, ভারত ও সুইডেনের পাখিরাও একই ডাক ব্যবহার করে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, একই শব্দ হোয়াইট-ব্রাউড স্ক্রাবরেন নামের আরেক প্রজাতিও ব্যবহার করে—কিন্তু কেবল কোকিল দেখলে। অন্য শিকারি প্রাণীর সামনে এমন ডাক শোনা যায় না।

অনলাইন বন্যপ্রাণী ডাটাবেস ঘেঁটে গবেষকেরা এমন ২১টি পাখি প্রজাতির সন্ধান পান যারা পরজীবী পাখি দেখলে একই ডাক দেয়। কিছু প্রজাতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, আবার কিছু একে অপরের থেকে ৫ কোটি বছর আগে আলাদা হয়ে গেছে এবং এখন ভিন্ন মহাদেশে বাস করে। এ ডাক পাখিদের মধ্যে বিশেষ তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে তা শুধু নিজেদের প্রজাতির মধ্যে নয়—ভিন্ন প্রজাতির মধ্যেও একধরনের যৌথ বার্তা হিসেবে কাজ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ বিশেষ ডাকটি পাখিদের জন্মগত নয়—তারা অন্য পাখিদের দেখে শেখে কখন এই শব্দটি ব্যবহার করতে হয়। তবে একে শুনে যে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটি পুরোপুরি স্বাভাবিক বা সহজাত আচরণ। সাধারণত প্রাণিজগতে কোনো ডাক হয় পুরোপুরি স্বভাবজাত, নয়তো পুরোপুরি শেখা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো দুটি বৈশিষ্ট্যই একসঙ্গে দেখা গেছে।
নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি ভাষা বিকাশের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি মানুষের ভাষা জন্মের প্রাথমিক ধাপের এক জীবন্ত উদাহরণ—যেখানে একটি নির্দিষ্ট শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ তৈরি হয়, অন্য প্রজাতির প্রাণীরাও সে অর্থ বুঝে প্রতিক্রিয়া জানায়।
প্রায় ১৫০ বছর আগে চার্লস ডারউইন বলেছিলেন, প্রাণীরা যখন তাদের স্বাভাবিক ডাককে নতুন অর্থে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখনই ভাষার সূচনা ঘটে। আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে কোকিল দেখে পাখিদের অভিন্ন হুঁশিয়ারি ডারউইনের সে ধারণাকেই জীবন্ত করে তুলেছে।
দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে।










