সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে, শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি মহুয়া গাছ। বসন্তের শেষভাগে, অন্যান্য গাছের মতো এই গাছেও নতুন পাতা আসে, ফুল ফোটে। কয়েক সপ্তাহের জন্য গাছটি তাজা হয়ে ওঠে। তবে এই সতেজতা বেশিদিন থাকে না। কয়েক মাসের মধ্যেই পাতাগুলোতে দেখা দেয় ছোট ছোট কালো বিন্দু। কখনো সেই দাগ গুটির মতো আকার নেয়। ধীরে ধীরে গাছটির প্রায় সব পাতাই কুঁচকে যেতে শুরু করে।
এই লক্ষণগুলো আসলে এক ধরনের পোকা—অ্যাফিডের উপস্থিতির প্রভাবে হয়। অ্যাফিড গাছের পাতায় রস চুষে খায়, এবং সেই প্রক্রিয়ায় একটি আঠালো নিঃসরণ তৈরি হয়। এই নিঃসরণের ওপর জন্ম নেয় এক ধরনের কালচে ছত্রাক, যা পাতাকে ঢেকে ফেলে এবং গাছের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিঘ্ন ঘটায়। ফলাফল—পাতার বিকৃতি, রং পরিবর্তন, কখনো সময়ের আগেই ঝরে যাওয়া।
অ্যাফিড নতুন কোনো প্রাণী নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে এটি বহুদিন ধরেই রয়েছে। আমাদের কৃষিক্ষেত্র, ফলজ গাছ কিংবা শহরের পার্ক—সবখানেই এদের দেখা মেলে। তবে প্রকৃতিতে অ্যাফিডের সংখ্যা সাধারণত নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিছু পরজীবী কীট, পিঁপড়া, লেডিবাগ, এমনকি ছোট পাখিরা অ্যাফিড খেয়ে তাদের ভারসাম্য বজায় রাখে। সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন অ্যাফিডকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করা প্রাণীর সংখ্যা কমে যায়।

ছবি— দ্য গার্ডেনস সাপ্লাই
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই গাছটিতে বছরের পর বছর অ্যাফিডের এমন আধিপত্য কেবল একটি গাছের শারীরিক দুরবস্থার চিত্র নয়—এটি একটি বাস্তুসংস্থান সংকটের চিহ্ন। একটি গাছের ওপর তখনই এমন প্রভাব পড়ে, যখন তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবজগতের স্বাভাবিক চক্রে ছেদ পড়ে। তবে এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি গাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার অন্যান্য অংশেও, এমনকি দেশের বিভিন্ন জায়গার অনেক ফসলের খেত বা গাছেই একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। কোথাও পাতায় কালচে ছত্রাক, কোথাও পাতা কুঁচকে গিয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। এটি হয়তো এখনো মারাত্মক সংকট নয়, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
শহরের তাপমাত্রা প্রতি বছরই বাড়ছে। ঋতুচক্রের পরিবর্তন, আর্দ্রতা ও বাতাসের গুণমান পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই কিছু প্রজাতি তাদের জায়গা হারাচ্ছে, আর কিছু—যেমন অ্যাফিড মানিয়ে নিচ্ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে। এটি বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্যের এক ধরনের পরিবর্তন, যা পরিবেশকে সরাসরি না বদলে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে রূপান্তরিত করছে।
বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় যেমন অ্যাফিডখেকো প্রাণীর প্রয়োজন আছে, তেমনই প্রয়োজন আছে অ্যাফিডেরও। কারণ, এই ছোট প্রাণীগুলো পরিবেশে কিছু ইতিবাচক ভূমিকা রাখে—তারা কিছু পোকা-পতঙ্গ ও পাখির খাদ্য, এবং জীববৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে একটি শৃঙ্খলার ভেতরেই তাদের জায়গা। তবে সবারই থাকতে হয় একটি নিয়ন্ত্রিত পরিসরে।
এই লেখার উদ্দেশ্য অ্যাফিডকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়; বরং একটি পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টামাত্র। শহরের একটি গাছ, যার পাতা বছরের পর বছর বিকৃত হয়ে থাকে, সেই গাছটিও হয়ে উঠতে পারে বৃহত্তর প্রাকৃতিক পরিবর্তনের এক ছোট্ট ইঙ্গিত—যার প্রভাব হয়তো আমরা এখনই পুরোপুরি বুঝতে পারি না, কিন্তু উপেক্ষা করাও চলে না।










