মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বা সুখ থাকা মানেই কি সে প্রকৃত অর্থে ভালো আছে? নতুন এক বৈশ্বিক গবেষণা বলছে— না, অন্তত সব সময় নয়। গবেষকরা মনে করেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সুখের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক নেই। শুধু সুখী হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং 'ফ্লোরিশিং' বা সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক সুস্থতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জীবন সার্থকতা ও সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক।

তারা বলছেন, সুখ একটি অনুভূতি। কিন্তু ‘ফ্লোরিশিং’ বা সমৃদ্ধ জীবনযাপন হলো বহুমাত্রিক চিত্র— যেখানে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক সম্পর্ক, জীবনের অর্থ এবং চরিত্রের বিকাশ সব কিছুই বিবেচনায় নেয়া হয়। খুব কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও মানুষ সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারে— এমন তথ্যই উঠে এসেছে এ বৈশ্বিক গবেষণায়।

'গ্লোবাল ফ্লোরিশিং স্টাডি' নামের এ গবেষণায় পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির হিউম্যান ফ্লোরিশিং প্রোগ্রাম। এতে সহায়তা করেছে বেইলর ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর স্টাডিজ অব রিলিজিয়ন, গ্যালাপ এবং সেন্টার ফর ওপেন সায়েন্স। গবেষণাটি চলানো হয়েছে বিশ্বের ২২টি দেশ ও হংকংয়ের ২ লাখেও বেশি মানুষের ওপর, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগলিক বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটি বিশ্বের প্রায় ৬৪ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে।

এ গবেষণায় সবচেয়ে বেশি তৃপ্তির জীবনযাপন করতে দেখা গেছে প্রথমে ইন্দোনেশিয়ায়, এরপর মেক্সিকো ও ফিলিপাইনের মানুষকে। অথচ এ দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর তালিকায় উপরের দিকেই নেই।

গবেষণার সবচেয়ে দৃষ্টিকাড়া ফলাফল হলো— তরুণদের মধ্যে সমৃদ্ধ জীবনযাপন বা তৃপ্তির হার সবচেয়ে কম। তাদের মধ্যে বয়সের সঙ্গে এ প্রবণতাও বেড়েছে।

হার্ভার্ডের প্রধান গবেষক ড. টাইলার ভ্যানডারওয়িলে বলেন, তরুণদের কাছ থেকে আমরা স্পষ্টভাবে শুনছি—কিছু একটা ভুল হচ্ছে।

কিন্তু এমনটা কেন হচ্ছে? গবেষকদের মতে, উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবল প্রতিযোগিতা ও চাকরির দৌড়ে পড়ুয়ারা আগেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে, অনেক তরুণ মনে করছেন— পরিশ্রম করেও সমাজে তারা ওপরে উঠতে পারবেন না। এই ‘সামাজিক অচলতা’র অনুভূতিই তাদের কাছে জীবনের অর্থ কমিয়ে দিচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোতে ফ্লোরিশিংয়ের হার অত্যন্ত বেশি, কিন্তু তারা সুখী দেশের তালিকায় অনেক পিছিয়ে। অন্যদিকে সুইডেন বা যুক্তরাষ্ট্র সুখী দেশের মধ্যে থাকলেও ফ্লারিশিংয়ের স্কোর তাদের তুলনামূলকভাবে কম।

এর কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা জীবনের সচ্ছলতা থাকলেও যদি জীবনের অর্থ না থাকে, সম্পর্ক দুর্বল হয় কিংবা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি কমে যায়, তাহলে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে।

তাদের দাবি, কেউ যদি দেখতে পান তার জীবনে অর্থের অভাব নেই, কিন্তু কোনো অর্থবোধ বা উদ্দেশ্য নেই, তাহলে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়া একটি ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।