বাফেল—একটি সাধারণ ঘাস, যা অস্ট্রেলিয়াজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটিকে উইড অফ ন্যাশনাল সিগনিফিকেন্স বা জাতীয় আগাছা হিসেবে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আফ্রিকার স্থানীয় বহুবর্ষজীবী এই ঘাস প্রথম অস্ট্রেলিয়ার আউটব্যাক অঞ্চলে প্রবেশ করে উটের দড়ির সঙ্গে বীজ আটকে। পরে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে চারণভূমির জন্য এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে রোপণ করা হয়। তুলার মতো ফুল ফোটা লম্বা ঝোপযুক্ত এই ঘাসটি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার অন্তর্দেশীয় শুষ্ক ও আধাশুষ্ক এলাকাগুলোতে বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃষকরা বাফেল ঘাস পছন্দ করেন। কারণ এটি তাদের গবাদি পশুর জন্য পুষ্টিকর, খরা সহনশীল এবং আগুনের পরও দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। এছাড়া এটি পতিত জমি ঢেকে মাটি ক্ষয় ও ধুলাবালি প্রতিরোধ করে। তবে এর দ্রুত ও আগ্রাসী বিস্তার দেশীয় প্রজাতির ঘাস ও উদ্ভিদকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং এর উচ্চ দাহ্য ক্ষম দাবানল বিস্তারে ভূমিকা রাখে। বিশেষত মরুভূমির আদিবাসী এলাকাগুলোতে এটি মারাত্মক সমস্যা তৈরি করেছে। সেখানে বাফেল নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুল শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়।
আদিবাসী মরুভূমি জোটের বোর্ড সদস্য ওয়ান্ডা মিলার বলেন, ‘বাফেল ঘাস আমাদের দেশকে গ্রাস করছে। এটি আমাদের ভূদৃশ্য পরিবর্তন করছে, স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণী ধ্বংস করছে, আগুনের ধরন পরিবর্তন করছে এবং ঝুঁকি ও তীব্রতা বৃদ্ধি করছে।’
বাফেল এরই মধ্যে মধ্য অস্ট্রেলিয়ার আনাঙ্গু পিটজান্টজাটজারা ইয়াঙ্কুনিজাটজারা অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় এটি ২০১৫ সাল থেকে ক্ষতিকর আগাছা হিসেবে ঘোষিত হয়েছে এবং উত্তরাঞ্চলেও ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যেখানে ২০২৩ সালে এর কারণে সৃষ্ট দাবানলে এক লাখ হেক্টরেরও বেশি জাতীয় উদ্যান পুড়ে গিয়েছিল।
২০২২ সালে আদিবাসী মরুভূমি জোটের একটি সম্মেলনে ওয়ারু রেঞ্জাররা উমুওয়া ঘাসটি নিয়ে এক বিবৃতি উপস্থাপন করেন, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাফেলকে ‘জাতীয় আগাছা’ হিসেবে তালিকাভুক্তির ভিত্তি তৈরি করে। এরই মধ্যে ৮৩টি সংগঠন এই মনোনয়নকে সমর্থন জানিয়েছে।
ওয়ান্ডা মিলার আরো বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের জমিগুলো আবার স্বাভাবিক হোক। বাফেল ঘাসকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় আগাছা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে আমরা এই আগাছার বিরুদ্ধে আরো কার্যকর সহায়তা পেতে পারি।’
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় ৩২টি উদ্ভিদ ‘জাতীয় আগাছা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত, যার মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাকবেরি, লান্টানা, ফায়ারউইড ও সেরেটেড টাসক। এগুলোর মূল্যায়ন করা হয় বিস্তার ক্ষমতা, অনুপ্রবেশের মাত্রা এবং পরিবেশ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ভিত্তিতে।
তবে কুইন্সল্যান্ডের কিছু কৃষক মনে করেন, বাফেল ঘাস আসলে ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য’ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কুইন্সল্যান্ড ক্যাটল বোর্ডের সভাপতি লয়েড হিক বলেন, ‘এটি কুইন্সল্যান্ডের চারণ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এটি লাখ লাখ কেজি গরুর মাংস উৎপাদনের ভিত্তি, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বাফেলকে সরিয়ে দিলে গো মাংস শিল্প ভেঙে পড়বে।’
বাফেল চাষের সঙ্গে যুক্ত কৃষকরা আগুনের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত এবং তারা মৌসুম অনুযায়ী মাঠ ছোট করে রেখে সেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
চারাগাছ বিশেষজ্ঞ জুডি আর্ল বলেন, ‘অতিরিক্ত চারণে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া মাটিতে বাফেল ঘাস ধুলাবালি ও ক্ষয় কমাতে সহায়ক।’ তিনি কুইন্সল্যান্ডজুড়ে ভূমি পুনর্জন্ম প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।
আর্ল আরো বলেন, ‘দেশীয় ঘাস উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় টিকে থাকতে পারে, তবে অতিচারণে সেগুলো হারিয়ে যায়। আর মাটি খালি থাকলে, বাফেল সেখানে ঘাস জন্মায় ও মাটি ঢেকে রাখে। একদম অনাবৃত জমির চেয়ে খানিকটা ঘাস থাকাটা ভূমির স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।’
আর্ল মন্তব্য করেন, ‘যদি আপনার লক্ষ্য হয় সর্বোচ্চ পশু উৎপাদন, তাহলে আপনি বাফেলের পক্ষেই থাকবেন। আর যদি দেশীয় প্রজাতি রক্ষা বা পুনরুদ্ধার করতে চান, তাহলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন।’










