প্রযুক্তির হাত ধরে সময় বদলায়, বদলায় জীবনব্যবস্থাও। ২০০০ সাল থেকে সেরা উদ্ভাবনের তালিকা করে আসছে টাইম ম্যাগাজিন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে সেরা উদ্ভাবনের তালিকা করার পাশাপাশি নতুন অধ্যায় শুরু করেছে তারা। ‘বেস্ট ইনভেনশনস হল অব ফেম’- গত ২৫ বছরের আইকনিক সব উদ্ভাবন জায়গা পেয়েছে এ তালিকায়। যার মাধ্যমে ২৫ বছরে মানুষের কল্পনা, চিন্তা ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা প্রতিফলিত হয়েছে।
গত ২৫ বছরের আইকনিক উদ্ভাবনগুলোকে পাঁচ পর্বে উপস্থাপন করবে বণিক বার্তা। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব—
২০০৬: ইউটিউব
২০০৫ সালের এপ্রিলে ইন্টারনেট দুনিয়ায় নতুন যুগের সূচনা হয়। সে বছর ইউটিউব তাদের প্রথম ভিডিও আপলোড করে। কয়েক মাস পর ভিডিও আপলোডের সংখ্যা হয় ৭০ হাজার। আর সেই সংখ্যা দৈনিক দুই কোটি ছাড়িয়েছে। ২০০৬ সালে টাইম ম্যাগাজিন ইউটিউবকে বছরের অন্যতম সেরা আবিষ্কার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই বছরই এটি গুগলের হাতে বিক্রি হয় ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে।
যখন ভিডিও প্রযুক্তি উন্নতির নতুন স্তরে পৌঁছাচ্ছিল, তখনই ইউটিউবের উত্থান। সে বছর টাইম পারসন অব দ্য ইয়ার হিসেবে ঘোষণা করেছিল ইউ অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকেই। কারণ, ইউটিউব ব্যবহারকারীর তৈরি কনটেন্টের বিপ্লবে নেট দুনিয়ার আমূল পরিবর্তন হয়েছিল। যেখানে প্রতিটি মানুষই হতে পারে নির্মাতা, কণ্ঠস্বর, প্রভাবক।
২০০৭: অ্যাপল আইফোন
২০০৭ সালের জুনে প্রথম আইফোন বাজারে আনে অ্যাপল। টেক জায়ান্টটি এর মাধ্যমেই কম্পিউটার ও আইপডের বাইরে টাচস্ক্রিন ও মোবাইল প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রবেশ করে। উদ্বোধনের সময় ৪ গিগাবাইট ও ৮ গিগাবাইট-এর দুটি সংষ্করণ বাজারে এনেছিল আইফোন।
সে বছরই টাইম ম্যাগাজিন আইফোনকে ‘বর্ষসেরা আবিষ্কার’ ঘোষণা করে। ২০০৭ সালে টাইম–এর প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অ্যাপল বিক্রি করেছিল প্রায় ১৪ লাখ আইফোন। ১৮ বছর পর, এখন পর্যন্ত অ্যাপল বিক্রি করেছে ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) আইফোন। ২০২৪ সালে অ্যাপল ছিল বিশ্বের শীর্ষ স্মার্টফোন নির্মাতা।
২০০৭, গুগল ম্যাপস স্ট্রিট ভিউ
ডিজিটাল মানচিত্র সেবা আমাদের চলাফেরার ধরন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ২০০৭ সালে গুগল এতে স্ট্রিট ভিউ ফিচার যুক্ত করে। এতে ছবির মাধ্যমে যেকোনো জায়গার বাস্তব দৃশ্য দেখা যায়।
টাইম ম্যাগাজিন একে বছরের সেরা আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। শুরুর দিকে এটি কেবল কয়েকটি শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন স্ট্রিট ভিউ বিস্তৃত হয়েছে ১১০টি দেশে। আর এর পরিধি ছড়িয়ে আছে ১২ মিলিয়ন মাইলজুড়ে।
২০০৮: লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার
জেনেভার কাছে, ভূগর্ভে প্রায় ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় কণাত্বরণযন্ত্র, লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার। ১৭ মাইল দীর্ঘ বৃত্তাকার এ টানেলের ভেতর প্রোটন ও আয়নগুলোকে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ঘুরিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। আর এ উদ্ভাবনের মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা আমাদের জগতের অতি ক্ষুদ্রতম গঠন উপাদানগুলোকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বহু ধারণা বাস্তবে যাচাই করতে ২০০৮ সালে এটি চালু করা হয়। টাইম ম্যাগাজিন সে সময় লিখেছিল, বিশাল এ যন্ত্র ভরের অস্তিত্ব ও মহাবিশ্বের মাত্রা সর্ম্পকিত অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে।
২০১২ সালে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারেই প্রথমবারের মতো হিগস বোসন কণা অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। কণাটি মহাবিশ্বকে ভর প্রদান করে, আর এর আবিষ্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা নোবেল পুরস্কারও লাভ করেছেন।
২০০৮: স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট
ভয়াবহ পারমাণবিক বিস্ফোরণ, ভূমিকম্প কিংবা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে শস্য রক্ষায় এ ভল্ট তৈরি করা হয়। নরওয়ের স্পিটসবের্গেন দ্বীপে আর্কটিক সার্কেল থেকে স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত এ প্রকল্প পরিচালনা করে নরওয়ে সরকার, গ্লোবাল ক্রপ ডাইভারসিটি ট্রাস্ট এবং নর্ডিক জিন রিসোর্স সেন্টার। স্থানটি নির্বাচনের পেছনে বিজ্ঞানের পাশাপাশি কৌশলগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই খুব কম, ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে, আর স্থায়ী বরফের কারণে বিদ্যুৎ না থাকলেও ভেতরের ঠান্ডা পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকে। এখানে প্রতিটি বীজের নমুনা এমনভাবে সংরক্ষিত যে, শত শত বছর পরেও তা অঙ্কুরোদ্গমে সক্ষম।
বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রায় ছয় হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের ১৩ লাখ বীজের নমুনা এখানে সংরক্ষিত আছে। ২০০৮ সালে ভল্টটি নির্মাণের পরই টাইম ম্যাগাজিন একে বছরের সেরা উদ্ভাবনের তালিকায় স্থান দেয়। টাইম কর্তৃপক্ষ এ ভল্ট সম্পর্কে লিখেছিল, সুপারম্যান যেমন তার গোপন ঘাঁটি বানিয়েছিল পর্বতের গভীরে, তেমনি মানবজাতির ভবিষ্যৎ রক্ষায় এই আর্কটিক দুর্গ তৈরি করা হয়েছে।
২০১৫ সালে গৃহযুদ্ধে নিজেদের বীজভান্ডর ধ্বংস হলে এ ভল্ট থেকে প্রথম বীজ উত্তোলন করে সিরিয়া।
২০০৮: ২৩ অ্যান্ড মি ডিএনএ টেস্ট
২০০৮ সালে, মানুষের শরীর, পরিচয় ও উত্তরাধিকার নির্ণয়ে বিশেষ কিট আবিষ্কার করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ২৩ অ্যান্ড মি। টেস্টটি ছিল সহজ কিন্তু যুগান্তকারী। মাত্র ৩৯৯ ডলারে পাওয়া যেত একটি ছোট লালা পরীক্ষার কিট। আর এ পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে থাকা বিভিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্য, সম্ভাব্য রোগের ঝুঁকি, এমনকি বংশপরিচয়ের তথ্যও পাওয়া যেত।
সে কারণেই টাইম ম্যাগাজিন একে স্থান দিয়েছিল বছরের অন্যতম ‘বেস্ট ইনভেনশনস’ তালিকায়। ২৩ অ্যান্ড মি শুধু ব্যক্তিগত তথ্য দেয়াতেই থেমে থাকেনি। তাদের বিশাল ডেটাবেজ ব্যবহার করে মানুষের জিনগত বিজ্ঞানে বিপ্লবও এসেছে।
এখন পর্যন্ত ১৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এ পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের শরীরে লুকিয়ে থাকা তথ্য জেনেছে। কেউ কেউ খুঁজে পেয়েছে শতাব্দী পুরনো বংশপরিচয়।
২০০৯: ডাইসনের ব্লেডহীন ফ্যান
২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বেস্ট ইনভেনশনে জায়গা করে নেয় ডাইসনের ব্লেডহীন ফ্যান। এগুলো ঐতিহ্যবাহী ফ্যানের মতো নয়। ভিন্নভাবে কাজ করে এ ফ্যান, দেখতেও অনেক আধুনিক ও আকর্ষণীয়। ফ্যানটি এয়ার মাল্টিপ্লায়ার বেসের ভেন্টের মাধ্যমে বাতাস টেনে নেয়। তারপর লুকানো ইম্পেলার ব্যবহার করে রিমের ভেতরে থাকা আয়তাকার র্যাম্প দিয়ে বাতাসকে একটি নিরবিচ্ছিন্ন, মসৃণ প্রবাহে বাইরে পাঠায়। এ প্রক্রিয়ায় এয়ার মাল্টিপ্লায়ার প্রযুক্তি বাতাসের প্রবাহকে ১৫ গুন বাড়িয়ে তোলে।
ব্লেড না থাকায় এ ফ্যান শিশুদের জন্য নিরাপদ। সহজে পরিষ্কার করা যায়। প্রচলিত ফ্যানের তুলনায় শব্দ কম করে। নাইট মোডে এটি আরো শান্ত থাকে। রিমোট-কন্ট্রোল এমনকি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও এ ফ্যানকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
২০০৯ সালে উদ্ভাবনের পর থেকে এখন পর্যন্ত এর জনপ্রিয়তা অপরিবর্তিত থাকায় একে ‘বেস্ট ইনভেনশনস হল অব ফেম’-এ জায়গা দিয়েছে টাইম ম্যাগাজিন।
২০০৯: ফিলিপস এলইডি বাতি
২০০৯ সালের আরেক বেস্ট ইনভেনশন এলইডি বাতিকে ‘বেস্ট ইনভেনশনস হল অব ফেম’-এ জায়গা দিয়েছে টাইম ম্যাগাজিন।
এলইডি বাতি ৬০ ওয়াটের প্রচলিত বাতির চেয়ে টেকসই ও জ্বালানি সাশ্রয়ী। আগের ইঙ্ক্যান্ডিসেন্ট বাতির সমান আলো দেয় এলইডি। তবে খরচ হয় ১০ ওয়াটের কম, এটি চলতে পারে ২৫ হাজার ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রচলিত বাতির চেয়ে ২৫ গুণ বেশি টেকসই।
২০১০: কিকস্টার্টার
কিকস্টার্টার মূলত একটি ক্রাউড ফান্ডিং বিষয়ক ওয়েবসাইট। একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কাছের মানুষ বা ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করে সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে এ ওয়েবসাইট উদ্ভাবন করা হয়। এর মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অনুদান দিয়েছে। এর ফলে সফল হয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজারেরও বেশি প্রকল্প। যার মধ্যে রয়েছে: প্রথম পেলোটন বাইক, ওকুলাস রিফট হেডসেট, অসংখ্য নাটক ও সিরিজ, সংগীত অ্যালবাম এমনকি অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রও।
২০১০ সালে টাইম ম্যাগাজিন কিকস্টার্টারকে বছরের ৫০টি সেরা আবিষ্কারের মধ্যে একটি হিসেবে ঘোষণা করেছিল। আর এবছর ‘বেস্ট ইনভেনশনস হল অব ফেম’ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে কিকস্টার্টার।










