একসময় বিয়াওয়োভিয়েজা জঙ্গলের প্রাণীরা দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত প্রাচীন বনভূমিতে নির্ভয়ে বিচরণ করত। কিন্তু ২০২২ সালে সে স্বাধীনতায় ছেদ পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে শরণার্থী ও অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে পোল্যান্ড তাদের বেলারুশ সীমান্তজুড়ে ১৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও সাড়ে পাঁচ মিটার উঁচু একটি লোহার প্রাচীর নির্মাণ করে। উদ্দেশ্য ছিল—মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো।
তবে কাঁটাতারে ঘেরা এই দেয়াল শুধু মানুষকেই আটকায়নি, আটকে দিয়েছে বিয়াওয়োভিয়েজা জঙ্গলের প্রাণীদেরও। দেয়ালের কারণে সীমিত হয়ে গেছে হাজার হাজার বন্যপ্রাণীর চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনাচরণ। বিশেষ করে উন্মুক্ত বনে বিচরণ করা প্রায় ১৫টি লিঞ্চ আটকে পড়ে পোল্যান্ড অংশে, ফলে এই বনবিড়াল প্রজাতিটি ভয়াবহ জেনেটিক সংকটে পড়েছে।
ক্যামেরা ও কাঁটাতার-সজ্জিত প্রাচীর এখন শুধু লিঞ্চ নয়, বুনো মোষ, নেকড়ে ও এল্কের মতো বড় প্রাণীরও চলাচল রুদ্ধ করে দিয়েছে। পোলিশ একাডেমি অব সায়েন্সের ম্যামাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক কাজ্জিনা নোভাক বলেন, ‘এত বৈচিত্র্যময় প্রভাব আমরা কল্পনাও করিনি।’
গার্ডিয়ানের খবর বলছে, ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার সময় সারা বিশ্বে মাত্র ছয়টি সীমান্ত প্রাচীর ছিল। আজ সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৪টিতে—আরো অনেক সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ‘আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলো ক্রমেই কঠোর ও সামরিকীকৃত হয়ে উঠছে।’
বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু সংকট ও অভিবাসনবিরোধী সরকারগুলোর উত্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কাঁটাতারের বেড়া। এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে শুধু মানুষ নয়—অন্যান্য প্রাণীকেও।
পোল্যান্ড-বেলারুশ সীমান্তের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণীরা এখন সীমান্ত প্রাচীরের আশেপাশে যেতে ভয় পায়, যেন এটা কোনো ভয়ঙ্কর শত্রু। বনভূমির মাঝখান দিয়ে প্রাচীর চলে গেলেও, এক বছরের বেশি সময় ধরে বসানো ৩৬টি ক্যামেরায় লিঞ্চের ছবি ধরা পড়েছে মাত্র দুইবার। বরং মানুষের আনাগোনাই সেখানে বেশি।
বনের নীরবতা ভেঙে দেয় প্রহরীদের গাড়ির শব্দ, গান, কুকুরের ঘেউঘেউ আর গুলির আওয়াজ—যা ২৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তঘেঁষা এলাকাজুড়ে জমা হতে থাকে প্লাস্টিকের বোতল, কম্বল ও অন্যান্য আবর্জনা, যা টেনে আনে কুকুর, বিড়াল এবং অন্যান্য স্ক্যাভেঞ্জার প্রাণী। কাজ্জিনা নোভাক বলেন, ‘এভাবে বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যে এক অস্বাভাবিক মেলামেশার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।’
বেলজিয়াম-জার্মানি সীমান্তের ‘লৌহ পর্দা’ (আয়রন কার্টেন) তুলতে সময় লেগেছে ২৫ বছর। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানকার লাল হরিণরা এখনো সেই পুরোনো বিভাজনরেখা পার হতে ভয় পায়—যদিও সেই সময়ের কোনো হরিণ এখন আর জীবিত নেই। অর্থাৎ, প্রাচীরের ক্ষত শুধু বর্তমানের নয়, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রয়ে যায়।
চীন-মঙ্গোলিয়া সীমান্তেও প্রায় তিন হাজার মাইলজুড়ে নির্মিত প্রাচীর আটকে দিয়েছে এশিয়াটিক ওয়াইল্ড অ্যাসদের বার্ষিক অভিবাসন। স্লোভেনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্তের প্রাচীর বিভক্ত করে দিয়েছে দিনারিক পর্বতশ্রেণীর গুরুত্বপূর্ণ ভালুক ও নেকড়ের আবাসভূমি। এখানে লিঞ্চদের মধ্যে এত উচ্চমাত্রার আত্মীয়মিল ঘটছে যে গবেষকরা শঙ্কা করছেন—এই সীমান্তই হয়তো তাদের বিলুপ্তির চূড়ান্ত ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।
২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনায় গবেষকরা সীমান্ত প্রাচীরের ক্ষতি কমানোর জন্য চারটি সুপারিশ করেছেন— প্রাচীরে প্রাণী চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত ফাঁক রাখা, আলোর ব্যবহার ও শব্দদূষণ কমানো, কাঁটাতারের পরিবর্তে প্রাণীবান্ধব নির্মাণ করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তত প্রতি ৫০০ মিটার অন্তর ছোট ছোট ফাঁক রাখতে হবে, যাতে প্রাণীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে প্রায় ২ হাজার মাইলজুড়ে দেয়াল নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০০ মাইল এলাকাজুড়ে রয়েছে দৃঢ় প্রাচীর। তবে এর মাত্র ৮০ মাইল এলাকায় এ-ফোর সাইজের কাগজের সমান ১৩টি ছোট গর্ত রাখা হয়েছে। এই গর্তগুলো দিয়ে কায়োটি, বুনো শুকর (পেকারি), আমেরিকান ব্যাজার এবং ছোট আকারের পর্বত সিংহ কষ্ট করে চলাচল করতে পারে। তবে হরিণ, ভালুক বা নেকড়ের মতো বড় প্রাণীরা আটকে পড়ে।
প্রাচীর শুধু মানুষকেই বিভক্ত করে না, প্রকৃতির চক্রকেও ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এই ক্ষত সারাতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নীতিমালা, উদার মানসিকতা এবং প্রকৃতির প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা।










