আমার বাবা মোবারক হোসেন খান সংগীত গবেষক
হিসেবে পরিচিত। যদিও তাঁর পেশাগত পরিচয় ছিল সরকারি কর্মকর্তা। ৩০ বছর তিনি বাংলাদেশ
বেতারে কর্মরত ছিলেন। এরপর আরো চার বছর শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব
পালন করে অবসর গ্রহণ করেন। তবে পারিবারিকভাবে সংগীতের একটি ধারা তার রক্তে বহমান ছিল।
তিনি জন্মেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বিখ্যাত সংগীত পরিবারে।
আমার পিতামহ ওস্তাদ আয়েত আলী খান ছিলেন একজন সুরসাধক, সুরবাহার শিল্পী। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের ছোট ভাই। খুব স্বাভাবিকভাবে জন্মের পর থেকেই সুরের সাথে পরিচয় আমার বাবার। ছোটবেলায় কথা বলতে শেখার সঙ্গে সঙ্গেই গান গাইতে শিখে গেলেন। বাসায় বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের চর্চা হয়। হারমোনিয়াম থেকে শুরু করে সেতার, সরোদ, সুরবাহার, বেহালা, তবলা-বাঁয়া আরো কত কী! বাসার আর সব শিশুদের মত আব্বাও হারমোনিয়ামটা টেনে নিয়ে গুণগুণ করে গান গাইতে শুরু করলেন। পরিবারে একটা রেওয়াজ ছিল, ছেলেরা যখন স্কুলে যাওয়ার মত বড় হতো তখন লেখাপড়ার পাশাপাশি তাকে কোনো একটা বাদ্যযন্ত্রে হাতেখড়ি দেওয়া হতো। আব্বাকে হাতেখড়ি দেওয়া হলো বেহালা যন্ত্রে। প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে আব্বা দাদুর বাদ্যযন্ত্রের কারখানায় চলে যেতেন। সেখানে আরো কয়েকজন একসঙ্গে শিখতেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আব্বার চাচাতো ভাই আমিনুর হোসেন খান। তিনি বাজাতেন এস্রাজ। আরেকজন ছিলেন উনার ভাগ্নে ওস্তাদ খুরশিদ খান। তিনি সেতারে তালিম নিতেন। পরে তিনি দেশের একজন সেরা সেতারশিল্পী হয়েছিলেন। আব্বা এনাদের সঙ্গে কয়েক বছর তালিম নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে পড়াশোনার চাপে হোক বা যে কোনো কারণে হোক, শেষ পর্যন্ত চর্চা ধরে রাখতে পারেননি। লেখাপড়ায় তিনি বরাবর ভালো ছিলেন। সেজন্য দাদুর দিক থেকে একটা চাপ ছিল ভালোভাবে লেখাপড়া করার জন্য।
ক্রমে আব্বা লেখাপড়া নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সংগীত চর্চাটা সেভাবে ধরে রাখতে পারলেন না। তার সংগীতচর্চা ছিল অনিয়মিত। বেহালা ছেড়ে দেওয়ার পরে তিনি ‘মন্দ্রনাদ’ নামে একটা যন্ত্র বেশ কিছুদিন বাজিয়েছেন। যন্ত্রটা অনেকটা বেহালার মতো, কিন্তু অনেক বড়। আর বাজানোর ধরনটা আলাদা। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের পরামর্শে ওস্তাদ আয়েত আলী খান এ যন্ত্রটা উদ্ভাবন করেছিলেন। এরপর কিছুদিন বাজিয়েছেন ‘চন্দ্রসারং’। এ যন্ত্রটাও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের পরামর্শে ওস্তাদ আয়েত আলী খান উদ্ভাবন করেছিলেন। এছাড়া তবলা বাজনো রপ্ত করেছিলেন ছোটবেলা থেকেই। ছাত্রজীবনে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অনুষ্ঠানে তবলা সঙ্গত করেছেন। তাছাড়া উচ্চাঙ্গ সংগীতেও তার দক্ষতা ছিল। চাচাতো ভাই ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ভাগনে ওস্তাদ খুরশিদ খানের মতো গুণী শিল্পীদের সঙ্গে বাজিয়েছেন তিনি। কিন্তু সবশেষে তার বাবার যন্ত্রটিকে আপন করে নিলেন। যন্ত্রের নাম সুরবাহার। বাবাকে একদিন বললেন, আমি সুরবাহার বাজাবো। দাদুর খুব আদরের ছেলে ছিলেন আব্বা। তার কোন আব্দারে দাদু না বলতেন না। নিজের সুরবাহার যন্ত্রটা ছেলেকে বাজাতে দিলেন।
রীনাত ফওজিয়া। ছবি: বণিক বার্তা
আব্বার লেখাপড়া শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাইনর স্কুলে। পরবর্তী সময়ে অন্নদা হাইস্কুল, কুমিল্লা জেলা স্কুল, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ করার পর বেতারে কর্মজীবন শুরু করেন। এ সময় রেয়াজ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তখন সংগীত গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। প্রথমে আমাদের সংগীত পরিবারের ইতিহাস লেখা শুরু করেন। তারপর সংগীতের তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক বিষয়গুলো নিয়েও লেখা শুরু করেন। ক্রমে সংগীত গবেষক হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান।
নিছক পরিচিতি নয়, এ পরিচয় তাকে মর্যাদার
আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। সংগীত নিয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি পেয়েছেন একুশে পদক (১৯৮৬) ও
স্বাধীনতা পদক (১৯৯৪)। গবেষণা সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং অনুবাদে অলক্ত সাহিত্য
পুরস্কারেও (২০১০) ভূষিত হয়েছেন। সংগীত ছাড়াও সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। বিশ্বসাহিত্যের
উল্লেখযোগ্য কিছু রচনা তিনি অনুবাদ করেছেন। এছাড়া ছোটদের জন্য লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধ
নিয়ে লিখেছেন। ‘সংগীতসাধক অভিধান’, ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও তাঁর পত্রাবলি’, ‘বাদ্যযন্ত্র
প্রসঙ্গ’, ‘সংগীত প্রসঙ্গ’, ‘সংগীত সাধনা’, ‘রাগসংগীত’, ‘কণ্ঠসাধন’, ‘যন্ত্রসাধন’,
‘সংগীত গুণীজন’, ‘সংগীত মালিকা’, ‘আমার সংগীত স্বজন’, ‘ছোটদের সারেগামা ও সংগীতবিদ্যা’,
‘তিন সংগীতস্রষ্টা’, ‘গড়লো যারা সুরের তাজমহল’, ‘বাংলাদেশের মুসলিম সংগীতসাধক’, ‘আমি
যে বাজিয়েছিলেম’, ‘নজরুল সংগীতের বিচিত্র ধারা’, ‘নজরুল সংগীত প্রসঙ্গ’, ‘ছড়া গান’,
‘গানের স্বরলিপি’, ‘সংগীত সন্দর্শন’, ‘Music and its Study’, ‘Islamic
contribution to South Asia’s Classical music’, ‘Ustad Alauddin Khan: The Legend
in Music’ ইত্যাদি তার সংগীতবিষয়ক গ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো
হচ্ছে : মুক্তিযুদ্ধের গান, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের
সেরা গল্প’ তার সংকলন ও সম্পাদনায় প্রকাশিত গ্রন্থ। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তিনি ১২০টির
বেশি বই লিখেছেন।
কাজের বাইরে আমাদের কাছে তিনি ছিলেন
একজন অসাধারণ স্নেহময় পিতা। খুব ছোটবেলায় আমাদেরকে তিনি প্রতিদিন গল্প শোনাতেন। যতদিন
আমরা নিজেরা পড়তে শিখিনি, ততদিন তিনি একের পর এক ঠাকুর মার ঝুলির গল্প নিজে পড়তেন, তারপর নিজের ভাষায় নিজের মত করে আমাদের
শোনাতেন। সে যে কী আনন্দ ছিল আমাদের জন্য, তা বলে বোঝানো যাবে না। এক সময় তার মনে
হলো দেশী গল্প অনেক শোনানো হয়েছে। তখন আব্বা বিদেশী গল্প পড়ে পড়ে তা বাংলা করে শোনাতে
লাগলেন আমাদের। বিদেশী গল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে গ্রিম ব্রাদার্সের লেখা ‘হ্যান্সেল অ্যান্ড গ্রেটেল’ গল্পটির কথা। হ্যান্সেল ও গ্রেটেল দুই ভাইবোন পানি আনতে গিয়ে সৎমায়ের
চক্রান্তে হারিয়ে গিয়েছিল। বই থেকে অনুবাদ করে আব্বা এসব গল্প আমাদের শোনাতেন। তারপর
এক পর্যায়ে কাগজ-কলমে অনুবাদ করতে শুরু করেন। পত্রিকায় তা ছাপা হয়। শুধু এ গল্পই না,
আরো অনেক বিদেশী গল্প তিনি অনুবাদ করেন। এগুলো সব বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
আরেকটা খুব আনন্দের স্মৃতি আছে। ছোটবেলায়
স্কুলে আমাদের যে বাংলা বই পড়ানো হতো তাতে অনেক ছড়া ও কবিতা থাকতো। আমরা এগুলো মুখস্থ
করতাম। আব্বা আমাদের জন্য এগুলো সুর করে গান বানিয়ে দিতেন। যেমন, ‘পাখী সব করে রব রাতি
পোহাইলো, কাননে কুসুমকলি সকলে ফুটিলো’, কিংবা ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই’
এগুলো সব আমাদের কাছে গান হয়ে গিয়েছিল। খুব উৎসাহ নিয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে তিনি এ ছড়াগুলোর
সুর করে ফেলতেন। তারপর আমাদের ডেকে সেগুলো শিখিয়ে দিতেন। অবশ্য সুর করার সময়ই গান অর্ধেকের
বেশি তোলা হয়ে যেতো। কারণ আমরা তখন আব্বার আশপাশেই ঘুরঘুর করতাম।
বড় হওয়ার সময় আব্বা আমাদের লেখাপড়ায়
সবচেয়ে বেশি তাগিদ দিতেন। কিন্তু আমরা তিন ভাইবোন রক্তের টানে সদর্পে সংগীতের জগতে
পদার্পণ করি। আব্বা প্রথম দিকে চাননি আমরা সংগীতের জগতে আসি। কিন্তু আমাদের অর্জনগুলো
তাকে আনন্দ দিতো।
মানুষ হিসেবে আব্বা ছিলেন খুব সময়ানুবর্তী,
নিয়মানুবর্তী, কাজে নিষ্ঠাবান, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান। বাইরের কাজে এত ব্যস্ত থাকার
পরও পারিবারিক জীবনের আনন্দটাই তার কাছে বড় ছিল। আমাদের যে কোনো কাজে আব্বাকে কখনো
পাইনি এমন কখনো হয়নি। শেষ জীবনে তার আলঝেইমার্স ডিজিজ হয়। অসুখটা যে আলঝেইমার্স ডিজিজ, সেকথা আমরা অনেক পরে
জেনেছি। আলঝেইমার্সের একটা বহিঃপ্রকাশ ডিমেনশিয়া অর্থাৎ স্মৃতিভ্রংশ।
আব্বার শেষ দিনটা যে অকস্মাৎ এত কাছে
এসে যাবে, কখনো ভাবিনি। বাবা সবসময় নিজের কাজে ডুবে থাকতেন। সব সময় অন্যের সুবিধা দেখতেন,
প্রয়োজনে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। ঠিক এরই স্বাক্ষর রেখে গেলেন জীবনের শেষ বেলায়। কাউকে
না জানিয়ে ঘুমের মধ্যে নীরবে এক জগত থেকে অন্য জগতে চলে গেলেন। তারিখটা ছিল ২৪ নভেম্বর
২০১৯।
লেখক: গার্হস্থ্য
অর্থনীতি কলেজের অধ্যাপক ও সেতারশিল্পী।










