প্রযুক্তির হাত ধরে সময় বদলায়, বদলায় জীবন ব্যবস্থাও। ২০০০ সাল থেকে সেরা উদ্ভাবনের তালিকা করে আসছে টাইম ম্যাগাজিন। ২০২৫ সালে সেরা উদ্ভাবনের তালিকা করার পাশাপাশি নতুন অধ্যায় শুরু করেছে তারা। ‘বেস্ট ইনভেনশনস হল অব ফেম’- গত ২৫ বছরের আইকনিক সব উদ্ভাবন জায়গা পেয়েছে এ তালিকায়। যার মাধ্যমে ২৫ বছরে মানুষের কল্পনা, চিন্তা ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা প্রতিফলিত হয়েছে।
গত ২৫ বছরের আইকনিক উদ্ভাবনগুলোকে পাঁচ পর্বে উপস্থাপন করবে বণিক বার্তা। আজ থাকছে এর চতুর্থ পর্ব—
২০১৭: ফেন্টি বিউটি ফাউন্ডেশন
২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত বাজারে নির্দিষ্ট কিছু শেডের ফাউন্ডেশন পাওয়া যেত। দীর্ঘদিন ধরে প্রসাধনী শিল্পে গায়ের রঙের বৈচিত্র্য উপেক্ষিত ছিল। গাঢ় ত্বকের মানুষের জন্য উপযুক্ত ফাউন্ডেশন খুঁজে পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। সে বছরই প্রতিটি মানুষের প্রকৃত ত্বকের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৪০ শেডের ফাউন্ডেশন বাজারে আনেন রিহানা।
আর এ ফাউন্ডেশন শেডকে সে বছর বেস্ট ইনোভেনশন তালিকায় জায়গা দেয় টাইম ম্যাগাজিন। তখন টাইম লিখেছিল, ‘মেকআপ হলো এক ধরনের গোপন অস্ত্র। কিন্তু সবার জন্য এ অস্ত্র নাগালের মধ্যে ছিল না। কারণ বেশিরভাগ কোম্পানি হালকা বা মাঝারি ত্বকের রঙের ক্রেতাদের জন্যই পণ্য তৈরি করে, ফলে গাঢ় ত্বকের মানুষরা বঞ্চিত হন।’
রিহানার এ ফেন্টি বিউটি ফাউন্ডেশন এখনো প্রাসঙ্গিক। আর তাই একে ‘বেস্ট ইনভেনশনস হল অব ফেম’ তালিকাভুক্ত করেছে টাইম।
২০২০: মডার্না ও ফাইজার-বায়োএনটেকের এমআরএনএ ভ্যাকসিন
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ মহামারির অচলাবস্থার সময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বড় অর্জন, প্রযুক্তিনির্ভর ভ্যাকসিন এমআরএনএ-এর উদ্ভাবন। এ প্রযুক্তির মূল উপাদান মেসেঞ্জার আরএনএ, যা ভাইরাসের জেনেটিক কোড ব্যবহার করে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে।
খুব দ্রুত গতিতে ভ্যাকসিনটি বাজারজাত করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। আগে কোনো ভ্যাকসিন তৈরি হতে অন্তত চার বছর লেগেছিল, সেখানে কভিড ভ্যাকসিন তৈরি হয় এক বছরেরও কম সময়ে। জানুয়ারিতে কভিড ভাইরাসের জেনেটিক সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয় আর মে মাসেই ভ্যাকসিনের মানবদেহে ট্রায়াল শুরু হয়। ডিসেম্বরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর অনুমোদন পায় ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার ভ্যাকসিন।
টাইম ম্যাগাজিন তখন লিখেছিল, ‘একটি মহামারি হয়তো নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য কঠিন সময়, কিন্তু কভিড-১৯ ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞরা ঠিক সেটাই করছেন—এবং ফলাফল আশাব্যঞ্জক।’

বর্তমানে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্যান্য সংক্রামক রোগের টিকা উন্নয়নের কাজ করছে মডার্না ও ফাইজার-বায়োএনটেক।
২০২২: জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অর্জন নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। ১৯৯৫ সালে প্রস্তাবিত, দুই দশকেরও বেশি সময়ের প্রচেষ্টায় নির্মিত ও প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি মহাকাশ দূরবীনটি ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। সাত টন ওজনের এ টেলিস্কোপে রয়েছে ২১ ফুট ৩ ফুট প্রশস্ত প্রধান আয়না, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ লাখ মাইল দূরে অবস্থান নিয়ে মহাবিশ্বের অতীতের গভীরে নজর দিতে সক্ষম।
জেমস ওয়েব এখন পর্যন্ত মহাকাশে পাঠানো সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী টেলিস্কোপ। এর শক্তিশালী ইনফ্রারেড ক্যামেরা মহাবিশ্বের জন্মলগ্নের দৃশ্য ধারণ করতে পারে। এরই মধ্যে অসংখ্য চমকপ্রদ ছবি পাঠিয়েছে জেমস ওয়েব, যার মধ্যে রয়েছে অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণরত একটি গ্রহের ছবিও।
টাইম ম্যাগাজিন ২০২২ সালের অন্যতম সেরা উদ্ভাবন হিসেবে জেমস ওয়েবকে অন্তর্ভুক্ত করে লিখেছিল, ‘এটি এমন এক দূরবীন, যা এখন পর্যন্ত নির্মিত অন্য যেকোনো টেলিস্কোপের চেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত মহাকাশে নজর দিতে পারে।’
এটি বিজ্ঞানীদের এমন সব নাক্ষত্রিক বস্তু ও ছায়াপথ পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছে, যা আগে কোনো যন্ত্রে সম্ভব ছিল না। মহাবিশ্বের আদিম আলো, নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর প্রক্রিয়া, এমনকি সম্ভাব্য জীবনের উপযোগী গ্রহ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে এ টেলিস্কোপ।










