এনসেফালাইটিস হচ্ছে মস্তিষ্কের প্যারেনকাইমার একটি প্রদাহজনিত রোগ। যার কারণে বিভিন্ন নিউরোসাইকোলজিক্যাল উপসর্গ নিয়ে রোগীরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এ ভাইরাস সংক্রমিত রোগটি শিশু, কিশোর, বয়স্ক যেকোনো বয়সেই হতে পারে। ভাইরাল এনসেফালাইটিস বিশ্বব্যাপী একটি উল্লেখযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

রোগতত্ত্ব: বিশ্বের ২০৪টি দেশের ওপর এনসেফালাইটিসের ডিজিজ বারডেন ও গত ৩০ বছরে এর বিবর্তিত প্যাটার্ন নিয়ে চীন একটি সমীক্ষা চালায়। শুধু ২০১৯ সালেই বিশ্বব্যাপী ১৪ লাখ ৪৪ হাজার ৭২০ জন এনসেফালাইটিস রোগী ছিল, তার মধ্যে ৮৯ হাজার ৯০০ জনের মৃত্যু হয়।

নিম্ন আর্থ-জনসংখ্যাগত সূচকভুক্ত (এসডিআই) দেশ যেমন দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম ও পূর্ব সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২০১৯ সালে এনসেফালাইটিসের সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব ছিল। গত কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সেখানে প্রতি ২ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে একজন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। 

এ ভাইরাসের সংক্রমণ হয় সাধারণত পোকামাকড়, পরিবেশগত ভেক্টর অথবা একজন আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে থাকলে। এটি মানুষের মধ্যে গুরুতর রোগ সৃষ্টি করে। এ রোগে মৃত্যুর হার অনেক বেশি এবং যারা বেঁচে থাকে তাদের মধ্যে স্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়।

কারণ: হারপেস সিমপ্লেক্স ভাইরাস পশ্চিমা বিশ্বে এনসেফালাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। শৈশবে এনসেফালাইটিসের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে জন্য দায়ী ভাইরাসগুলো হলো মাম্পস ভাইরাস, হামের ভাইরাস ও ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাস।

জাপানিজ এনসেফালাইটিস (জেই) ভাইরাস এশিয়ায় ভাইরাল এনসেফালাইটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাস হলো নিপাহ ভাইরাস, ডেঙ্গু ভাইরাস। বাংলাদেশে জাপানিজ এনসেফালাইটিস প্রাদুর্ভাব প্রথম ১৯৭৭ সালে ময়মনসিংহ জেলার একটি গ্রামীণ এলাকায়।

জেই ভাইরাস সংক্রমণের বেশির ভাগই উপসর্গবিহীন, যেখানে ১ শতাংশেরও কম রোগীর মধ্যে ক্লিনিক্যাল লক্ষণ দেখা দেয়। বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে সারা বছর বিক্ষিপ্তভাবে এর সংক্রমণ ঘটে। এ ভাইরাস সংক্রমণ প্রাথমিকভাবে গ্রামীণ কৃষি এলাকায় ঘটে যেখানে ধান উৎপাদন এবং ঘন ঘন বন্যা হয়। এন্ডেমিক দেশগুলোয় যেহেতু শূকর ও ওয়েডিং পাখিগুলোকে প্রায়ই খামারে বা মাঠে মানুষের কাছাকাছি রাখা হয়, তাই তারা মানুষের মধ্যে সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক হোস্ট।

বাংলাদেশে নিপাহের প্রাদুর্ভাব প্রথম নিশ্চিত হয়েছিল ২০০৩ সালে মেহেরপুর জেলায়। এ সময় দেশের ২০ জেলায় ১৯৬ জনের মধ্যে নিপাহ এনসেফালাইটিসের সংক্রমণ হয়। আর এর মধ্যে ১৫০ বা ৭৭ শতাংশের মৃত্যু হয়। শীতের মাসে গ্রামীণ পরিবেশের উপাদেয় খাবার কাঁচা খেজুরের রস পান করা প্রথম ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কী কী উপসর্গ হলে বুঝবেন এনসেফালাইটিস

যেকোনো ভাইরাল এনসেফালাইটিসে ভাইরাল প্রোড্রোমে সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি, অলসতা ও মাসলে ব্যথা থাকে। অতি তীব্র এনসেফালাইটিসের লক্ষণগুলো নিম্নরূপ ও এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

• চেতনা হ্রাস এবং ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন

• ঘাড় ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া

• ফটোফোবিয়া (আলো সহ্য করতে না পারা)

• অলসতা

• যেকোনো ধরনের খিঁচুনি

• তীব্র বিভ্রান্তি বা অ্যামনেস্টিক অবস্থা

• হাত-পা প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়

রোগ নির্ণয়ে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা সহায়ক হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিএসএফ স্টাডি এবং ব্রেন ইমেজিং (এমআরআই), যেটি মেডিকেল কলেজ ও টারশিয়ারি সেন্টারগুলোয় করা সম্ভব।

কী চিকিৎসা অতি সত্বর দিতে হবে

রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন। হাসপাতালে পৌঁছার আগে নিম্নোক্ত প্রি-হাসপাতাল চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে, যেটি সবার জানা আবশ্যক।

•          শক বা হাইপোটেনশনের জন্য মুখে খাবার স্যালাইন অথবা আইভি স্যালাইন প্রয়োজন

•          এয়ারওয়ে সুরক্ষা (পরিবর্তিত মানসিক অবস্থার রোগীদের ক্ষেত্রে)

•          খিঁচুনি সতর্কতা

•          হাসপাতালে যাওয়ার পথে অক্সিজেন ও আইভি অ্যাকসেস সুরক্ষিত

•          যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অ্যাসাইক্লোভিরের প্রথম ডোজ বা অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স চালু করা

রোগীদের যেসব খারাপ পরিণতি হয়

এটি নির্ভর করে ভাইরাসের ধরন এবং রোগীর স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর। বয়সের সীমা (এক বছরের কম ও ৫৫ বছরের বেশি), ইমিউন কম্প্রোমাইজড স্ট্যাটাস এবং আগে থেকে বিদ্যমান নিউরোলজিক রোগ থাকলে তাদের পরিণতি খারাপ হয়। চিকিৎসা না করা হারপেস সিমপ্লেক্স বা জেই এনসেফালাইটিসের মৃত্যুহার ৫৯ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং কার্যত সব চিকিৎসা না করা বা দেরিতে শুরু করলে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা দেখা দেয়। অন্যদিকে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে চিকিৎসা করালে মৃত্যুর হার গড়ে ২০ শতাংশ।

অতি তীব্র এনসেফালাইটিসের আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা বেঁচে যায় তাদের  ক্লান্তি, বিরক্তি, খিঁচুনি, শ্রবণশক্তি হ্রাস, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং অন্ধত্বের মতো সমস্যা থাকতে পারে। স্বাভাবিক পর্যায়ে আসতে কয়েক মাস এমনকি বছর পর্যন্ত সময় নিতে পারে। নিবিড় পুনর্বাসন, স্পেশাগত থেরাপি, ভাষা থেরাপি, পুষ্টি ও নিউরোসাইকোলজি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে রোগীদের সর্বোত্তম সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করতে পারে।

এনসেফালাইটিস কি প্রতিরোধ করা যেতে পারে?

এনসেফালাইটিস প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব নয়, তবে কিছু সংক্রমণ যা এটি ঘটায় তা টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। যেমন হাম, মাম্পস ও রুবেলা (এমএমআর), জাপানি এনসেফালাইটিস ও র‍‍্যাবিস ভ্যাকসিন। এ কারণে আপনার টিকা আপ টু ডেট রাখুন, বিশেষ করে যখন এনসেফালাইটিসজনিত ভাইরাস আছে বলে এমন এলাকায় ভ্রমণ করেন।

ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার রোধে সাহায্য করার জন্য সঠিক স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা জরুরি এবং হাত ধোয়া লাগবে। মশা ও টিক এক্সপোজার এড়িয়ে চলুন। সর্বোপরি জনসচেতনতা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক (নিউরোলজি বিভাগ), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, ঢাকা