মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ এনসেফালাইটিস। বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে এ রোগ হয়। যে কেউ এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে শিশু ও বয়স্করা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন। এছাড়া যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, শরীরে এইচআইভি ভাইরাস বা এইডস রয়েছে এবং ধূমপান করেন তাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে এনসেফালাইটিসের লক্ষণ হিসেবে ফ্লু বা সাধারণ জ্বর ও সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দেখা গেলেও ধীরে ধীরে সংক্রমণ তীব্র হয় এবং রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ না করলে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে এনসেফালাইটিস হতে পারে। যেমন— 

হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (এইচএসভি): এনসেফালাইটিসের সবচেয়ে বড় কারণ হারপিস ভাইরাস। এইচএসভি টাইপ-১ ভাইরাসের সংক্রমণে এনসেফালাইটিস হয়। এইচএসভি টাইপ-১ দ্বারা সৃষ্ট এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হলে মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।   

অন্যান্য হারপিস ভাইরাস: অন্যান্য হারপিস ভাইরাস যেমন এপস্টাইন-বার ভাইরাসের সংক্রমণে মনোনিউক্লিওসিস এবং ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাসের সংক্রমণে চিকেনপক্স হয়, যা এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। 

এন্টারোভাইরাস: এ ভাইরাসগুলোর মধ্যে রয়েছে পোলিওভাইরাস এবং কক্সস্যাকিভাইরাস, যার সংক্রমণে এনসেফালাইটিস হতে পারে।   

র‍‍্যাবিস বা জলাতঙ্ক: পশুর লালা নিঃসৃত ভাইরাস র‍্যাবিস বা জলাতঙ্কের কারণে তীব্র সংক্রমণজনিত এনসেফালাইটিস হয়, যা দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে।

নিপাহ ভাইরাস: বাদুড় বা পশুপাখির খাওয়া ফলমূল ও খেজুরের কাঁচা রস খেলে নিপাহ ভাইরাসজনিত এনসেফালাইটিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আরবোভাইরাস: আরবোভাইরাসের সংক্রমণ এনসেফালাইটিসের অন্যতম কারণ। মশা ও বিভিন্ন পরজীবী দ্বারা এটি ছড়ায়। জাপানি এনসেফালাইটিস এ ভাইরাসের কারণে হয়, যা মূলত কিউলেক্স মশার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। ১৫ বছর বা এর চেয়ে কম বয়সী শিশুদের মধ্যে জাপানি এনসেফালাইটিসে আক্রান্তের হার বেশি। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এবং মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশে এর সংক্রমণ তীব্র হয়।  

এইচআইভি ভাইরাস: এইডস রোগের ভাইরাস মস্তিষ্কে ছড়িয়ে এইচআইভি এনসেফালাইটিস হতে পারে।

এছাড়া হাম, মাম্পস, রুবেলা ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ছোঁয়াচে ভাইরাসের সংক্রমণেও এনসেফালাইটিস হওয়ার তীব্র ঝুঁকি থাকে।   

লক্ষণ ও উপসর্গ

এনসেফালাইটিসের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে— 

• জ্বর

• মাথাব্যথা

• অস্থিসন্ধিতে ব্যথা

• ক্লান্তি বা দুর্বলতা

• ঘুম কম হওয়া 

• খাবারে অরুচি

• বমি বমি ভাব

• খিঁচুনি 

• পেশির দুর্বলতা

• মুখ বা শরীরের নির্দিষ্ট কোনো অংশ নড়াচড়া করতে না পারা 

• ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া

• শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া 

• বিভ্রান্তি বা মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা

• স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া

রোগ নির্ণয়

প্রাথমিকভাবে মস্তিষ্কের এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এনসেফালাইটিস নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করতে মেরুদণ্ডের সিএসএফ (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) পরীক্ষা করা জরুরি। হারপিস ভাইরাসে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হলে ইইজি (ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাম) পরীক্ষার মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজনে এইচআইভি পরীক্ষা করা যেতে পারে।

এনসেফালাইটিসের চিকিৎসা : এনসেফালাইটিস রোগের লক্ষণ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে কোনো রোগী যদি জ্বর হওয়ার পর বারবার অচেতন হয়ে পড়েন, অসংলগ্ন আচরণ করেন এবং খিঁচুনি হয় তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রোগের তীব্রতাভেদে রোগীকে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ওষুধ বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ও ইনজেকশন দেয়া হয়, যা এ রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর। রোগের তীব্রতা বেশি হলে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হতে পারে। এক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা জরুরি। অনেক সময় মাথার খুলির ফোলা ভাব এবং চাপ কমাতে কর্টিকোস্টেরয়েডজাতীয় প্রদাহরোধী ওষুধ সেবন করা লাগতে পারে। এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত রোগী পরবর্তীকালে পারকিনসন, স্মৃতিভ্রম, বুদ্ধি কমে যাওয়া এমনকি বধিরতার মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা যেমন ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও স্পিচ থেরাপির প্রয়োজন হয়।  

প্রতিরোধে করণীয় : এনসেফালাইটিস প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হলো এ রোগের কারণ হতে পারে, এমন ভাইরাসের সংস্পর্শ এড়াতে সতর্কতা অবলম্বন করা। এজন্য—

• স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করুন।

• খাওয়ার আগে ও শৌচাগার ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করুন। 

• দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও থালাবাসন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।

• যেকোনো ফলমূল বা শাকসবজি খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।

• বসতবাড়ির আশপাশ লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড়মুক্ত রাখুন।

• বাড়ির উঠোনে, ফুলের টবে বা অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা পানিতে যেন মশা ডিম পাড়তে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখুন।  

লেখক: মেডিসিন ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নিউরোলজি বিভাগ, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাকা