কোনো ব্যক্তি যখন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্যোগ বা বড় ধরনের বিপদের মুখোমুখি হন, তখন তিন ধাপে এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। প্রথম ধাপে তিনি বোঝার চেষ্টা করেন বিপদটি কী এবং এটি কতটুকু ক্ষতি করবে? দ্বিতীয় ধাপে এ দুর্যোগের কারণে তার শারীরিক ও আবেগের প্রতিক্রিয়া ঘটে; যেমন ভয় পায়, পালিয়ে যায়, রেগে যায় বা কেঁদে ফেলে। তৃতীয় ধাপে সে তাৎক্ষণিকভাবে বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। স্মৃতিতে এই অভিজ্ঞতাটি রেখে দেয় পরবর্তী সময়ে সে কীভাবে রক্ষা পাবে সে জন্য। এগুলো দুর্যোগের সাধারণ প্রতিক্রিয়া।

অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ও বিপদ ঘটে যাওয়ার মুহূর্তের পর থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা দিতে পারে তীব্র মানসিক চাপ (অ্যাকিউট স্ট্রেস ডিজঅর্ডার), কনভার্সন ডিজঅর্ডার (হিস্টিরিয়া), সাময়িক উন্মাদনা (ব্রিফ সাইকোসিস), আতঙ্ক (প্যানিক ডিজঅর্ডার), দুশ্চিন্তা, অস্বাভাবিক শোক, আচরণ, কথা বলা ইত্যাদি। দুই সপ্তাহ পর থেকে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেখা যায় আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপ (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার), বিষণ্নতা, অপরাধবোধে ভোগা ইত্যাদি।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের (পিটিএসডি) ক্ষেত্রে ফ্ল্যাশ ব্যাকের মতো দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার স্মৃতি বারবার মনের মধ্যে আসতে থাকে আর তৈরি হয় মনের ক্ষত।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের শুরুটা হয় দুর্যোগের অনেক পরে আর স্থায়িত্বও হয় অনেক দীর্ঘ। এ সমস্যায় দুর্যোগ স্মৃতি বারবার মনে পড়া, দুর্যোগসংশ্লিষ্ট উদ্দীপককে এড়িয়ে চলা, অতিমাত্রায় সজাগ থাকা, খিটখিটে হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ থাকতে পারে।

কাদের পিটিএসডি হতে পারে

 যারা সরাসরি ট্রমাটিক ঘটনার মধ্যে পড়েছিলেন এবং পরে সুস্থ অবস্থায় বা আহত অবস্থায় বেঁচে গেছেন।

 উদ্ধারকর্মী, যারা ট্রমার পরপরই ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছেন।

  যারা পরবর্তী সময়ে ট্রমার মুখোমুখি হওয়া মানুষটির অভিজ্ঞতা সরাসরি শুনেছেন (চিকিৎসক, সাংবাদিক)।

  যারা দূর থেকে বিষয়টি শুনেছেন, পত্রিকায় পড়েছেন বা টিভিতে দেখেছেন।

যেসব ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর সাধারণত পিটিএসডি হতে পারে:

  প্রাকৃতিক দুর্যোগ

  যৌন নিপীড়ন, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন অভিজ্ঞতা

  যুদ্ধ, সংঘাত, দাঙ্গা ইত্যাদির মুখোমুখি হওয়া

  সড়ক দুর্ঘটনা

  পারিবারিক সহিংসতা, অবহেলা, অ্যাবিউজ

  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভায়োলেন্স (বুলিং, র‌্যাগিং)

  শৈশবে কষ্টের অভিজ্ঞতা

মনে রাখতে হবে

            ট্রমা হওয়া মানেই পিটিএসডি না—সবার পিটিএসডি হবে না

            ট্রমার পরপরই পিটিএসডি হয় না

            ট্রমার পর মন খারাপ সাময়িক স্ট্রেস একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া

            পিটিএসডি হচ্ছে ট্রমার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া—এটি একটি রোগ

            সাধারণত ট্রমার তিন থেকে ছয় মাস পর পিটিএসডি হতে পারে

পিটিএসডির সাধারণ লক্ষণ

            পূ্র্বশর্ত: মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে এমন দুর্ঘটনা উপলব্ধি বা প্রত্যক্ষ করা

            ঘটনাটির তিন-ছয় মাস পর ঘটনাটিকে ফ্ল্যাশব্যাক করা, দুঃস্বপ্ন দেখা

            দুর্ঘটনাটির কথা মনে করিয়ে দেয় এমন আলোচনা, ব্যক্তি, বস্তু, কাজ, স্থান, পরিবেশ, চিন্তা, অনুভূতিকে এড়িয়ে চলা

            সবসময় তটস্থ থাকা, সঙ্গে বিরক্তি ভাব, মনোযোগের সমস্যা আর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা

             দুর্ঘটনা বা আঘাতের কথা মনে এলে নানা ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়া। যেমন; বুক ধড়ফড় করা, বমি ভাব, ঘাম হওয়া, ঘাড়-মাথার মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি

            মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া

            মন খারাপ থাকা এবং দৈনন্দিন আর আনন্দদায়ক কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা

চিকিৎসা

ওষুধ আর সাইকোথেরাপি। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না।ৱ

কী কী করবেন:

            সক্রিয় ও আন্তরিকভাবে দুর্যোগপীড়িত মানুষের সান্নিধ্যে আসবেন।

            তাদের কথা মন দিয়ে শুনবেন।

            সহানুভূতির পরিবর্তে তাদের প্রতি সমানুভূতি প্রদর্শন করবেন।

            তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাবেন।

            দুর্যোগসংক্রান্ত সমস্যা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবের প্রতি সম্মান দেখাবেন এবং সেটা গ্রহণ করবেন।

            গোপনীয়তার প্রয়োজন সম্পর্কে সজাগ থাকবেন।

            অব্যাহত সেবা প্রদান নিশ্চিত করবেন।

কী করবেন না

            আক্রান্ত মানুষকে কোনো ধরনের সাহায্য, সহযোগিতা গ্রহণ করতে বাধ্য করবেন না।

            তাদের উপদেশ দেবেন না।

            স্বজনেরা যখন দুঃখ-দুর্দশার অনুভূতি প্রকাশ করেন, তখন তাদের বাধা দেবেন না।

            তাদের প্রতি করুণার মনোভাব প্রকাশ করবেন না।

            তাদের কোনো আচরণের প্রতি নিজস্ব অভিমত পোষণ করবেন না।

লেখক: ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক, চাইল্ড অ্যাডলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডলেসেন্ট মেন্টাল হেলথ (বিএসিএএমএইচ)