যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা সব আমদানি পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বনিম্ন শুল্ক ১০% এবং দেশটির প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে কিছু দেশের জন্য আরো বেশি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন নেতা ও সরকার কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউস এক তথ্য বিবরণীতে জানিয়েছে, ট্রাম্প কানাডা ও মেক্সিকো থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর নতুন ১০% বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করছেন না। তবে তার আগের আদেশ অনুযায়ী, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও ফেন্টানিল পাচার ইস্যুর কারণে এই দুই দেশের অনেক পণ্যের ওপর এখনো ২৫% পর্যন্ত শুল্ক বহাল রয়েছে।
এ শুল্কের ব্যাপারে রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের প্রতিক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো—
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ট্রাম্প আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক সংরক্ষণ করেছেন। তবে, ফেন্টানিল শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে, যেমনটি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রেও রয়েছে। আমরা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে লড়াই করব, আমাদের শ্রমিকদের সুরক্ষা দেব এবং আমরা জি-৭ এর সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলব।
ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, উত্তর আমেরিকার সরকারের আজকের (২ এপ্রিল) সিদ্ধান্তে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি, যা ব্রাজিলীয় রফতানি পণ্যের ওপর ১০% পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। আমরা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা মূল্যায়ন করছি, যার মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সহায়তা নেয়াও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বেশ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই এবং এটি আমাদের দুই দেশের অংশীদারিত্বের মূল আদর্শের পরিপন্থী। এটি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ নয়। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়াবে এবং আমেরিকান পরিবারের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি করবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সু শুল্ক আরোপেরত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যযুদ্ধ এখন বাস্তবতা হয়ে ওঠেছে। আমাদের সরকারকে এই বাণিজ্য সংকট কাটিয়ে উঠতে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করতে হবে।
নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্যমন্ত্রী টড ম্যাকক্লে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বাধীন প্রবাহ আমাদের স্বার্থের জন্য সর্বোত্তম। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আমরা আলোচনা করব এবং আমাদের রফতানিকারকদের সঙ্গে পরামর্শ করব এই নতুন শুল্কের প্রভাব বুঝতে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, স্পেন তার কোম্পানি ও শ্রমিকদের রক্ষা করবে এবং আমরা উন্মুক্ত বাণিজ্যের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকব।
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বাণিজ্যযুদ্ধ চান না জানিয়ে বলেন, আমরা বাণিজ্যে আরো বাধা আসুক তা চাই না। আমরা বাণিজ্যযুদ্ধ চাই না। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুঁজতে চাই, যাতে আমাদের জনগণ আরো ভালো জীবন উপভোগ করতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারিন কেলার-সুটার বলেন, আমরা দ্রুত আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করব। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং মুক্ত বাণিজ্য আমাদের মূলনীতি।
আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর ২০% শুল্ক আরোপ করার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শুল্ক কারো জন্যই লাভজনক নয়। আমাদের অগ্রাধিকার হবে আইরিশ কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে রক্ষা করা।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যাতে এক অনিবার্য বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানো যায়। বাণিজ্যযুদ্ধ আমাদের পশ্চিমা দেশগুলোকে দুর্বল করে দেবে এবং অন্য বৈশ্বিক শক্তিগুলোর লাভ হবে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল ইপিপির সভাপতি ম্যানফ্রেড ওয়েবার বলেন, আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের জন্য আজ মুক্তির দিন নয়, আজ প্রতিহিংসার দিন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ন্যায়সঙ্গত বাণিজ্যকে রক্ষা করছে না; বরং এটি ভয়ের দ্বারা চালিত এমন এক আক্রমণ যা দুই দিককেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে প্রস্তুত এবং ন্যায়সঙ্গত আলোচনার জন্য উন্মুক্ত।
কলম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরা সারাবিয়া বলেন, আমাদের জাতীয় শিল্প ও রফতানিকারকদের রক্ষা করার জন্য আমরা এই নতুন নীতিগুলো পর্যালোচনা করছি।
বিশ্ব নেতাদের এই প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করেছে যে, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। অনেক দেশ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা নতুন এক বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে পারে। এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ এই সংকট সমাধানে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না।










