ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার হুমকিও। ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এখন হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্য। এ ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নতুন এক চিত্র। র‍্যানসমওয়্যারের চেয়েও এখন বড় হুমকি হয়ে উঠেছে ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য চুরি, অর্থাৎ ক্রেডেনশিয়াল থেফট। খবর টেকমনিটর।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানি আইবিএমের এক্স-ফোর্স ২০২৫ থ্রেট ইন্টেলিজেন্স ইনডেক্স প্রতিবেদন বলছে, সাইবার হুমকির ধরন পাল্টে যাচ্ছে। এখন সাইবার অপরাধীরা বেশি মনোযোগ দিচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড চুরির দিকে। এসব তথ্য চুরি করে হ্যাকাররা বিভিন্ন সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারে কিংবা কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়। এটি সাইবার হামলার পদ্ধতিতে বড় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে ধারণা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

বিশ্বের ১৩০টির বেশি দেশে প্রতিদিন ১৫ হাজারের ঊর্ধ্বে সাইবার নিরাপত্তা কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে আইবিএম সম্প্রতি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য চুরি করা ‘ইনফোস্টিলার’ ম্যালওয়ারের ব্যবহার আগের বছরের তুলনায় ৮৪ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে সাইবার হামলার ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন হামলাকারীরা ব্যবহারকারীর আইডি-পাসওয়ার্ড চুরিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর র‍্যানসমওয়্যার হামলার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কমেছে।

আইবিএমের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের গ্লোবাল ম্যানেজিং পার্টনার মার্ক হিউজ এ বিষয়ে বলেন, ‘বর্তমানে সাইবার অপরাধীরা অনেক সময় কিছু “ভাঙচুর” (ক্ষতি) না করেই সিস্টেমে ঢুকে পড়ছে। জটিল ক্লাউড-ভিত্তিক পরিবেশে থাকা পরিচয় ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তারা সহজেই প্রবেশের পথ খুঁজে পাচ্ছে। তারা চুপিসারে দুর্বল পাসওয়ার্ড, ভুল কনফিগারেশন বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন না থাকার সুযোগে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।’

তার মতে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে এখন আর শুধু সাইবার আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টায় থেমে থাকলে চলবে না। বরং প্রো‌-অ্যাকটিভ বা সক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। যেমন আধুনিক অথেনটিকেশন ম্যানেজমেন্ট চালু করা, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের দুর্বলতা মেরামত করা ও রিয়েল টাইমে হুমকি শনাক্ত করার কার্যক্রম পরিচালনা করা। এতে করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হওয়ার আগেই তা রক্ষা করা যাবে।

আইবিএম এক্স-ফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর যেসব সাইবার আক্রমণ হয়েছে, তার ৭০ শতাংশই ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে—যেমন বিদ্যুৎ, পরিবহন বা স্বাস্থ্য খাত। এসব ঘটনার এক-চতুর্থাংশের বেশি ক্ষেত্রে সিস্টেমের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে আক্রমণ চালানো হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, র‍্যানসমওয়্যার, অর্থাৎ ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার দিয়ে ফাইল বা সিস্টেম লক করে অর্থ আদায়ের চেষ্টার পরিবর্তে এখন সাইবার অপরাধীরা বেশি ঝুঁকছে ডাটা চুরির দিকে। কারণ উন্নত শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয় ভূমিকায় সাইবার অপরাধীরা এখন আগের মতো সহজে র‍্যানসমওয়্যার ব্যবহার করতে পারছে না, তাই তারা গোপনীয় তথ্য চুরি করাকে ‘নিরাপদ ও লাভজনক’ পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সাইবার হামলার সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু ছিল এশিয়া ও উত্তর আমেরিকা। বিশ্বের মোট ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশই এ দুটি অঞ্চলে ঘটেছে। খাত অনুযায়ী দেখা গেছে, টানা চতুর্থ বছরের মতো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্পোৎপাদন।

প্রতিবেদনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সঙ্গে সম্পর্কিত উদীয়মান হুমকিগুলোকেও তুলে ধরেছে। গত বছর এআই প্রযুক্তির ওপর বড় আক্রমণ না ঘটলেও গবেষকরা সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে কঠোর পরিশ্রম করছেন, যেন সেগুলো শত্রুদের দ্বারা অপব্যবহার হতে না পারে।