প্রযুক্তির কল্যাণে হাতে আঁকা শিল্পকর্ম সংরক্ষণের জগতে আসছে এক নতুন পরিবর্তন। আগে যেসব পুরনো চিত্রকর্ম সংরক্ষণে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর সময় লাগত, এখন সেগুলো ঘণ্টার মধ্যেই মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে। এ কাজ করছে নতুন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পদ্ধতি। এতে সময় ও খরচ দুই-ই কমছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

শতাব্দীর ব্যবধানে তৈলচিত্রে ফাটল, বিবর্ণতা বা রঙ উঠে যাওয়ার মতো ক্ষতি হয়। এ ধরনের ছবি মেরামতের প্রচলিত পদ্ধতি দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। তাই অনেক সময় শুধু দামি শিল্পকর্মগুলোই সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে কম খরচে ও অল্প সময়ে ছবিগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে, এমনকি সেসব ছবিও, যেগুলো আগে গুরুত্ব পেত না।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এক গবেষক জানান, তিনি এ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন একজন ডাচ শিল্পীর আঁকা ১৫ শতকের একটি প্রাচীন ছবিতে। ক্ষতিগ্রস্ত তৈলচিত্রের ছবিতে নতুন প্রযুক্তিটি সফলভাবে প্রয়োগ করার দাবি তার। ছবিটি চারটি প্যানেলে বিভক্ত ছিল। এছাড়া হাজার হাজার ক্ষুদ্র অংশে রঙ উঠে গিয়েছিল। গবেষকের হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতিতে এটি ঠিক করতে প্রায় ২০০ ঘণ্টা সময় লাগত।

প্রথমে ছবিটি স্ক্যান করে ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার ৬১২টি অংশ চিহ্নিত করা হয়। এরপর একটি ডিজিটাল মাস্ক তৈরি করে এতে রঙ বসানো হয়। পরে একে একে নকশা প্রতিস্থাপন করা হয় ও অনুপস্থিত চেহারার অংশ অনুরূপ অন্য ছবির অংশ থেকে কপি করে বসানো হয়।

এ ডিজিটাল মাস্ক পরবর্তী সময় একটি স্বচ্ছ পলিমার পাতায় ছাপা হয়, যার ওপরে বার্নিশ দেয়া হয় যেন কালি ছড়িয়ে না যায়। এরপর সেটি আসল ছবির ওপর সযত্নে বসানো হয়। এতে মোট ৫৭ হাজার ৩১৪টি রঙ ব্যবহার করে খালি জায়গাগুলো পূরণ করা হয়েছে। এর ফলাফল পুরোপুরি নিখুঁত না হলেও দৃশ্যমানভাবে দারুণ উন্নত হয়েছে বলে মনে করেছেন চিত্রকররা।

তবে এ পদ্ধতিতে শুধু সমতল ও আগে থেকে বার্নিশ করা ছবিগুলোয়ই কাজ করা যায়। প্রয়োজনে এ পলিমার পাতাটি তুলে ফেলা বা মুছে ফেলা যায়। এতে আসল ছবিটিরও ক্ষতি হয় না।

গবেষকরা আশা করছেন, এ উপায়ে যেসব শিল্পকর্ম আগে সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট মূল্যবান ছিল না বলে ধরে নেয়া হতো, সেগুলোকে পুনরুদ্ধার করে গ্যালারিতে প্রদর্শন করা যাবে।

তবে এক্ষেত্রে কিছু নৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যেমন ছবির ওপর আলাদা স্তর বসানো কতটুকু সঠিক? অনুপস্থিত অংশ নকল করে বসানো কতটা গ্রহণযোগ্য? এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের গবেষণাই দেবে।

নরওয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি ইতিহাস জাদুঘরের অধ্যাপক বলেন, ‘প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এটি অনেক দ্রুত ও সাশ্রয়ী। দামি শিল্পকর্মের জন্য এটি উপযোগী না হলেও বহু মূল্যহীন ছবিও এখন গ্যালারিতে জায়গা পেতে পারে।’ —দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে