গত বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে ডিজিটাল নথি জালিয়াতি, বিশেষ করে ডিপফেকের ঘটনা ২৪৪ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ৫ মিনিটে একটি ডিপফেক আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। এনট্রাস্ট সাইবার সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘২০২৫ আইডেন্টিটি ফ্রড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই-নির্ভর জালিয়াতি মোকাবেলা করা এখন সংস্থাগুলোর জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ সাইবার অপরাধীরা এখন আরো উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করছে। খবর টেকমনিটর।

কাউকে প্রতারণা বা প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোনো নথি যেমন পিডিএফ, ছবি বা ফিজিক্যাল নথির স্ক্যান কপি ডিজিটাল মাধ্যমে তৈরি বা পরিবর্তন করার প্রক্রিয়াই ডিজিটাল নথি জালিয়াতি। এক্ষেত্রে সফটওয়্যার টুল বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যমান নথিগুলো সংশোধন করা হয় অথবা সম্পূর্ণ নতুন জাল নথি তৈরি করা হয়। যেমন ভুয়া আইডি ও পাসপোর্ট, নকল সনদপত্র কিংবা ব্যাংকের ভুয়া বিবরণী।

২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সংগৃহীত ডাটার ভিত্তিতে এ গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের সহায়তায় ডিজিটাল নথি জালিয়াতি ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা এ সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাইবার সিকিউরিটি সংস্থা এনট্রাস্ট জানিয়েছে, এ উন্নত পদ্ধতিগুলো অভূতপূর্ব মাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল অনবোর্ডিং বা ডিজিটাল নিবন্ধন প্রক্রিয়ার (অনলাইনের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই ও তথ্য সংগ্রহ) সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

উন্নত এআই-চালিত জালিয়াতির ব্যাপক বৃদ্ধির বিষয়টি বিশ্বব্যাপী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি গুরুতর সতর্কতা বলে উল্লেখ করেছেন এনট্রাস্টের সিনিয়র ফ্রডবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাইমন হর্সওয়েল। তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ডাটা দেখায় যে জালিয়াতকারীরা কত দ্রুত তাদের পদ্ধতি উন্নত করছে। এসব হুমকি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ব্যবসাসহ সরকার ও ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব ফেলছে।’

এনট্রাস্টের নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে নথিসংক্রান্ত জালিয়াতির ৫৭ শতাংশই ছিল ডিজিটাল। ২০২১ সালের তুলনায় বর্তমানে ডিজিটাল জালিয়াতি ১ হাজার ৬০০ শতাংশ বেড়েছে। এসব জালিয়াতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু ছিল জাতীয় পরিচয়পত্র।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, জেনারেটিভ এআই টুলস ও ‘অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ (অর্থ দিয়ে পরিষেবা ব্যবহার) প্লাটফর্মগুলোর সহজলভ্যতা সাইবার অপরাধীদের জন্য অত্যাধুনিক জালিয়াতি তৈরি করা অনেক সহজ করেছে। এসব প্লাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারকরা নানা কৌশল আয়ত্ত করে, যা ডিজিটাল নথি জালিয়াতির গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

গবেষণা বলছে, ২০২৪ সালে এআইয়ের বিকাশের কারণে প্রতি ৫ মিনিটে একবার ডিপফেক আক্রমণ ঘটেছে। অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এ জালিয়াতি মূলত অ্যাকাউন্ট হ্যাক, জাল অ্যাকাউন্ট খোলা ও ফিশিং স্ক্যামের জন্য ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনটি বলছে যে ফেস-সোয়াপ অ্যাপ্লিকেশন ও অন্য জেনারেটিভ এআই টুলস মানুষের বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত সঠিকভাবে অনুকরণ করতে সক্ষম, যা বায়োমেট্রিক যাচাই ব্যবস্থাও উপেক্ষা করতে সহায়ক।

এনট্রাস্টের গবেষণা আরো বলছে, ডিজিটাল জালিয়াতির কারণে এ বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর্থিক খাত, যেখানে মূল টার্গেট ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি প্লাটফর্ম। এ সেগমেন্টে (ক্রিপ্টোকারেন্সি) জালিয়াতির ঘটনা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২০২৩ সালের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

সাতটি দেশের ৭ হাজার ১২ জনের মতামতের ভিত্তিতে করা এ গবেষণায় দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে এআই-চালিত সাইবার হুমকির ব্যাপারে উদ্বেগ বাড়ছে, এটা জানা সত্ত্বেও এ-সংক্রান্ত প্রস্তুতি নিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক প্রতিবন্ধকতা ও উদাসীনতা রয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, এ ধরনের জটিল আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের শিক্ষাগত প্রস্তুতি ও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।