উচ্চ গতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে চলমান ‘ফাইভ-জি রেডিনেস’ প্রকল্পে সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে দরপত্র নিয়ে সমস্যার সূত্রপাত।

চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানসহ মোট তিনটি কোম্পানি কাজ পেতে প্রতিযোগিতা করছে। এতে আইনিসহ নানা জটিলতায় ১৯ মাসেও কাজ পায়নি কোনো প্রতিষ্ঠান। ফলে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উল্টো পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে আইন ও বিধি লঙ্ঘন, বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা, পরিচালনা বোর্ডের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে এমন অভিযোগে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বরখাস্ত করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। এর মাধ্যমে দেশের সব জেলা ও উপজেলাকে অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগের আওতায় আনা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয় ৪৬৩ কোটি টাকা। সরঞ্জাম সরবরাহে ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া সম্ভব হয়নি।

সেপ্টেম্বরের দরপত্রের প্রি-বিডিং সভা হয়। পরে সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী গঠিত তিন সদস্যের দরপত্র উন্মুক্তকরণ কমিটি গত বছরের ২০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দরপত্রটি উন্মুক্ত করে। দরপত্রে প্রস্তাব দাখিল করে তিনটি কোম্পানি। এদের মধ্যে দুটি চীনা কোম্পানি হলো জিটিই করপোরেশন ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিস লিমিটেড। অন্যটি হলো নকিয়া সলিউশন। হুয়াওয়ে প্রায় ৩২৬ কোটি টাকার দরপত্র, জিটিই ৪১৫ কোটি টাকা র এবং নকিয়া ৫৭৯ কোটি টাকার দরপত্র দেয়। হুয়াওয়ের সঙ্গে জিটিইর প্রস্তাবের ব্যবধান ৯০ কোটি টাকা। তবে সবাইকে যোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করে সাত সদস্যের কারিগরি কমিটি।

দরপত্রগুলোর মূল্যায়ন করে গত ৬ এপ্রিল বিটিসিএলের কাছে প্রতিবেদন পাঠায় কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। প্রতিবেদন অনুমোদন দিয়ে আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করার অনুমতির জন্য সুপারিশ করে কমিটি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকল্প কার্যালয় প্রধান (হোপ) অর্থাৎ বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আসাদুজ্জামান চৌধুরী দুটি দরদাতার বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠান কারিগরি কমিটির কাছে।

সরকারি ক্রয় নীতিমালা ২০০৮-এর নিয়ম অনুযায়ী, দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রকল্প কার্যালয়ের প্রধানকে কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন অনুমোদন করতে হবে। কিন্তু ২৪ দিন পর তিনি কমিটির কাছে ব্যাখ্যা চান। কমিটি ব্যাখ্যা দিলেও গত ১৮ মে প্রকল্প পরিচালকের অফিস জানায়, যে উত্তর পাওয়া গেছে তা সন্তোষজনক নয়। এরপর কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদন না করে বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন বলে নির্দেশনা দেন আসাদুজ্জামান চৌধুরী। এরপর ৪২ দিন পার হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

গত ২৫ মে প্রকল্প কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে নথি পাঠানো হয়। তিনি এখতিয়ার ও বিধিবহির্ভূতভাবে প্রকল্পের দরপত্র পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ (এ ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ) দরপত্র বা প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুমোদন বা কারণ ব্যাখ্যা ছাড়া দরপত্র বাতিল করে পুনর্মূল্যায়ন বা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের নির্দেশ দিতে পারেন না।

আবার তিনজন দরদাতার মধ্যে দুজনের সার্টিফিকেটের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তিনি পুরো দরপ্রস্তাবই বাতিল করেন, যা বিধিবহির্ভূত। অভিযোগ ওঠে, প্রকল্প পরিচালক আসাদুজ্জামান চৌধুরী পিপিআর-২০০৮-এ বর্ণিত সময়সীমা ১৫ দিন না মেনে ৫৫ দিন পরে পুনঃদরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি নিয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের পর পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ অনুসরণ করে নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দেয়া হলেও সেটি অনুসরণ করেননি তিনি।

গত ২৪ জুলাই বিটিসিএলের বোর্ড সভায় এ-সংক্রান্ত কার্যপত্রের ওপর আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয়, হোপের মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিধি ও প্রক্রিয়াগত স্পষ্ট বিচ্যুতি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালার আলোকে ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করে দরপত্র প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দেয়া হয়।

এদিকে দরপত্র বাতিলের বিষয়ে আসাদুজ্জামান চৌধুরীর আদেশের বিরুদ্ধে হুয়াওয়ে অভিযোগ দাখিল করে। গত ৯ অক্টোবর এ অভিযোগের ওপর শুনানি করে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)। সব পক্ষের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য নেয়ার পর ১৭ অক্টোবর সিপিটিইউ দরপত্র বাতিলের আদেশ অকার্যকর ঘোষণা করে। তিনটি প্রতিষ্ঠানকে রেসপনসিভ ঘোষণা করে। আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করার পর আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। প্রকল্পের ক্রয়কারী কার্যালয়ের প্রধান আসাদুজ্জামান চৌধুরীসহ অন্যদের (যদি থাকে) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়সহ বিটিসিএল বোর্ড কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেয়া হয়।

অন্যদিকে দরপত্র বাতিলে বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত দেয়ার অভিযোগে আসাদুজ্জামান চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিটিসিএল। তাকে প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মূল প্রতিষ্ঠান টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরে বদলি করা হয়। রিভিউ প্যানেল ও বোর্ডের নির্দেশনার পর দরদাতাদের আর্থিক প্রস্তাব ২৬ অক্টোবর খোলা হবে বলে নোটিশ দেয়া হয়। পরে ওই নোটিসের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হলে ২২ অক্টোবর আদালত সিপিটিইউর রিভিউ প্যানেলের আদেশের ওপর ১৫ দিনের স্থগিতাদেশসহ রুল জারি করেন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ায় সংক্ষুব্ধ হিসেবে আসাদুজ্জামান রিট পিটিশন দায়ের করেন। গত ৬ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত সিপিটিইউর রিভিউ প্যানেলের আদেশের ওপর ১৫ দিনের স্থগিতাদেশসহ দেয়া রুল আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন। আদালতের এ আদেশের পর ৮ নভেম্বর আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়েছে। এতে আপাতত দরপত্রের জটিলতা শেষ হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক বিষয়ে হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার হেড অব মিডিয়া তানভীর আহমেদ বলেন, ‘‌এ দরপত্রের অংশগ্রহণকারী হিসেবে হুয়াওয়ের প্রত্যাশা ছিল, সবকিছুই পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নীতি অনুসরণ করেই হবে। দরপত্রের প্রক্রিয়া এখন ভালো অবস্থানে আছে বলে হুয়াওয়ে মনে করে। কারণ রেগুলেটর, সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের নির্দেশনায় দরপত্রটি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা জানতে পেরেছি যে এ দরপত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের জন্য হুয়াওয়ে সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্য প্রস্তাব করেছে। আমরা খুব আশাবাদী যে প্রকল্প পরিচালক শিগগির আমাকে এ দরপত্রের বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করবে। আমরা সবসময়ের মতোই সর্বোচ্চ মানের সরঞ্জাম দিয়ে বিটিসিএল ও বাংলাদেশকে পরিষেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

জিটিই করপোরেশনের রেজা ইসলাম বলেন, ‘‌আমরা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা। তাই সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান যদি কোনো কারণে সরঞ্জাম সরবরাহ না করে, তখন আমরা কাজ করতে পারব।’