বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি প্রবেশযোগ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেমের (শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালন, নিয়ন্ত্রণ ও সম্পাদনের জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ডিভাইস-ভিত্তিক নেটওয়ার্ক) সংখ্যা এখন বাড়ছে। ইন্টারনেট-ভিত্তিক সরাসরি প্রবেশগম্যতার কারণে এসব ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেমে হ্যাকিং ও নানা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি, দিন দিন বেড়ে চলেছে। সাইবার সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান বিটসাইট জানিয়েছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেমসহ গুরুত্বপূর্ণ আইটি অবকাঠামো ও করপোরেট ডাটা হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার ঝুঁকি এখন সর্বোচ্চে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহার করে সরাসরি প্রবেশযোগ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেমের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এসে এ সংখ্যার প্রাক্কলিত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখের বেশিতে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ থাকায় এসব ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেম এখন হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। খবর টেকরাডার।

বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ছাড়াও পানি পরিশোধন নিয়ন্ত্রণ, বিল্ডিং অটোমেশন ডিভাইস বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং হাজার হাজার অটোমেটিক ট্যাংক গেজিং সিস্টেমের (এটিজি; স্টোরেজ ট্যাংকে সংরক্ষিত তরল পদার্থের গভীরতা, তাপমাত্রা ও পরিমাণ পর্যবেক্ষণে স্থাপিত কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং ডিভাইস) মতো সংবেদনশীল পরিষেবা ও ব্যবস্থাও উন্মুক্ত এ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেমগুলোর মধ্যে রয়েছে। কোনো ধরনের মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই এগুলো অনলাইনে সংযুক্ত। আবার অনেক সিস্টেমে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি রয়েছে, যার সুযোগ হ্যাকাররা সহজেই নিতে পারে।

এ বিষয়ে বিটসাইটের বিশেষজ্ঞ পেদ্রো উম্বেলিনো সতর্ক করে বলেছেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে হ্যাকাররা চাইলে এ নিরাপত্তা ঝুঁকিকে কাজে লাগিয়ে দূর থেকেই প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ব্যাঘাত ঘটানো বা নিরাপত্তা সেটিংও পরিবর্তন করে দিতে পারে।

তিনি আরো জানান, ২০২৪ সালে প্রাথমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইনে যুক্ত হয়েছে। আবার একই সময়ে ফ্রস্টিগুপ ও ফুক্সনেটের মতো ম্যালওয়্যারের আক্রমণের সংখ্যাও বেড়েছে।

এ সময় ইতালি ও স্পেনের প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থানকে হ্যাকার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক—উভয় পক্ষই কাজে লাগাচ্ছে উল্লেখ করে উম্বেলিনো বলেন, ‘এআই দুই দিকেই প্রভাব ফেলছে। এটি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বড় ডাটা প্রক্রিয়াজাত করতে সাহায্য করছে, আবার একই সঙ্গে আক্রমণকারীদেরও সুবিধা দিচ্ছে। একদিকে মেশিন লার্নিংকে কাজে লাগিয়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ ডাটা স্ক্যান ও অ্যানোমালি শনাক্ত করতে পারছে। অন্যদিকে এআইকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররাও টার্গেট শনাক্ত ও ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে দিতে পারছে।’

অন্যদিকে করপোরেট ক্লাউডের ক্ষেত্রেও সাইবার নিরাপত্তা হুমকি ক্রমশ বাড়ছে। রয়টার্সে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ক্লাউড প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান সেলসফোর্সের প্রায় একশ কোটি গ্রাহকের রেকর্ড চুরির দাবি করেছে ‘স্ক্যাটার্ড ল্যাপসাস হান্টারস’ নামের একটি সাইবার অপরাধী চক্র। তারা জানিয়েছে, সেলসফোর্স ব্যবহারকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম টার্গেট করে এসব তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে। হ্যাকারদের দাবি, তাদের সংগ্রহ করা রেকর্ডে রয়েছে গ্রাহকদের নানা ধরনের ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য। একই সঙ্গে তারা ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, কো-অপ ও গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের সিস্টেমেও প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে। তবে এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

হ্যাকারদের দাবি, তারা সরাসরি সেলসফোর্সের সিস্টেমে হ্যাক করেনি, বরং ‘ভিশিং’ বা ভয়েস ফিশিং ব্যবহার করেছে।

সেলসফোর্স হ্যাকারদের এ দাবি অস্বীকার করে বলছে, তাদের প্লাটফর্ম কোনোভাবেই হ্যাক হয়নি। তবে হ্যাকাররা ডার্ক ওয়েব লিক সাইটে হ্যাক হওয়া ৪০টির মতো কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে।