জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) টুল তৈরিতে ভিত্তিহীন তথ্য ব্যবহার করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ প্রযুক্তি নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্তিকর আশা দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি এমন অভিযোগ তুলেছেন একদল বিজ্ঞানী। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একটি এআই টুল তৈরি করে মেটা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরানোর ব্যাপারে অবাস্তব আশা তৈরি করেছে।

গত বছর মেটা জানিয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটি বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণে কার্যকর উপাদান খুঁজে বের করতে গবেষকদের সহায়তা করেছে। এজন্য একটি ‘যুগান্তকারী’ ডাটাসেট প্রকাশ করেছে মেটা, যার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানটি বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য মেশিন লার্নিং মডেলও তৈরি করেছে।

কিন্তু স্কটল্যান্ডের হেরিয়ট-ওয়াট বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইজারল্যান্ডের ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ইন লসানের (ইপিএফএল) বিজ্ঞানীরা বলছেন, মেটার গবেষণায় উল্লেখ করা ১৩৫টি উপাদানের কোনোটিই প্রকৃতপক্ষে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে বেঁধে রাখার মতো সক্ষম নয়। এমনকি এর কিছু উপাদান বাস্তবে অস্তিত্বই রাখে না।

ইপিএফএলের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক বেরেন্ড স্মিট মেটার এ গবেষণাকে নিরর্থক বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য, ‘হিসাব কম করে একটু বেশি চিন্তা করলে আরো ভালো হতো।’

মেটা যদিও দাবি করেছে, তাদের প্রকাশিত ডাটাসেট বৈধ গাণিতিক হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি, যা মেশিন লার্নিং প্রশিক্ষণের জন্য উপযুক্ত। সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টটি আরো জানিয়েছে, এসব উপাদানকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, নিশ্চিত সমাধান হিসেবে নয়।

মেটা ও জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা গবেষণাটি একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন।

মেটার গবেষকরা চার কোটি হিসাব করে এমন কিছু উপাদান খুঁজে বের করেন, যেগুলো বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড টানতে পারে, কিন্তু জলীয় বাষ্পের মতো অন্য উপাদান নয়।

তবে পরে গবেষকরা জানান, এসব উপাদানের কার্যকারিতা অনেক বেশি করে দেখানো হয়েছে এবং যত তথ্য দিয়ে মডেল প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, সেগুলোর একটি বড় অংশই ভুল ছিল।

গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক জর্জিয়া টেকের অধ্যাপক এজে মেডফোর্ড বলেন, সমালোচকরা গবেষণার উদ্দেশ্যই ভুল বুঝেছেন। এটি ছিল উন্নত স্ক্রিনিং পদ্ধতির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং গবেষণাক্ষেত্রে নতুন প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করার একটি উদ্যোগ।

এছাড়া বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি কার্বন অপসারণ প্রযুক্তিতে অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান ক্লাইমওয়ার্কস এমন কোনো উপাদান ব্যবহার করে না, যা মেটার গবেষক দল শনাক্ত করেছিল।

তবে সমালোচনা থাকলেও, জটিল ও ব্যয়বহুল একটি গবেষণায় কাজ করার জন্য মেটার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

এদিকে মেটার গবেষণা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু সমস্যা সমাধানে বড় কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্বজুড়ে এখন কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ প্রযুক্তিতে আগ্রহ বাড়ছে। মাইক্রোসফট, মেটার মতো বড় কোম্পানিগুলো নিজেদের কার্বন নিঃসরণ সমতলে আনতে এ খাতে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু পরিবেশবান্ধব হওয়ার এ প্রচেষ্টায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোই কার্বন নিঃসরণ কমাতে হিমশিম খাচ্ছে। গুগলের সাম্প্রতিক টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির মোট কার্বন নিঃসরণ ৫১ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৪ সালেই নিঃসরণ বেড়েছে ১১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সাপ্লাই চেইন সম্পর্কিত স্কোপ-৩ নিঃসরণ, যা এক বছরে ২২ শতাংশ বেড়েছে।

যদিও মোবাইল শিল্পে এ চিত্র ভিন্ন। গবেষণা বলছে, ২০১৯-২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মোবাইল সংযোগ ৯ শতাংশ ও ডাটা ব্যবহার চার গুণ বেড়েছে। বিপরীতে এ সময় অপারেশনাল কার্বন নিঃসরণ ৮ শতাংশ কমেছে।