সংস্কৃতি, মিথ এবং কঠোর সামাজিক প্রত্যাশার জটিল মিশ্রণ থেকে গড়ে ওঠা পরিবার কেবল প্রাকৃতিক, স্নেহপূর্ণ গঠন নয়; বরং এটি রূপ নিয়েছে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে। এখানে স্থির আদর্শ ও ভাঙা স্বপ্নের সংঘাত চলে। ‘নিখুঁত পরিবার’ একটি মিথ যা টিকে আছে প্রথা, পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পেশাগত সাফল্যের চাহিদা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিসর্জনের ওপর। অথচ পরিবরার মূলত তা-ই যা আমাদের ব্যর্থতাগুলোকে স্বীকার করে, আবার তার মধ্য দিয়েই আলো খুঁজে নেয়।

দৃক গ্যালারিতে নিজের করা ফটোস্টোরির সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজি ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন প্রেরণা ন্যানওয়াল। প্রেরণা ভারতের ঝাড়খণ্ডের মেয়ে।

ছয় মাস ধরে পাঠশালার ইন্টারন্যাশনাল রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে কর্মশালা করছেন। কর্মশালা শেষে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীতেই কথা হলো তার সঙ্গে। তার মতো পেরু, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের আরো নয়জন শিল্পী এ প্রদর্শনীতে তুলে ধরেছেন তাদের অন্তর্দৃষ্টি।

10

পাঠশালা আয়োজিত প্রদর্শনীর থিম ছিল ‘ফসফেন্স’। শিল্প শুধু দেখা নয়, অনুভবেরও ভাষা। ‘ফসফেন্স’ সেই অনুভূত আলোর নাম যা চোখ বন্ধ থাকলেও জ্বলে ওঠে।

কর্মশালার আরেকজন শিল্পী জার্মান নাগরিক পল স্টেনডার। স্বল্পভাষী পল তার ফটোস্টোরি ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’ নিয়েও বললেন খুবই সংক্ষেপে। মজার ছলে যা বললেন তার ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়, দার্জিলিংয়ের চারপাশে তাকালে মনে হয় জায়গাটি এখনো ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ পার করছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের চিহ্ন আজও দার্জিলিংয়ের স্থাপত্য, রেলপথ ও সমাজে বিদ্যমান। একই চিত্র কলকাতারও।

আলাপে আলাপে জানা গেল, স্টেনডার তার ফটোস্টোরি শুরু করেছিলেন দার্জিলিংয়ের চা বাগান থেকে। তারপর কাজ করতে করতে তিনি অনুভব করলেন, ব্রিটিশদের রোপণ করে যাওয়া চা নয় কেবল, পুরো দার্জিলিংয়ের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ধারণা আরো বিশাল।

11

নজর কেড়েছে প্রদর্শনীর অন্য কাজগুলোও। তার মধ্যে যে কয়টির নাম না বললেই নয়—পারফরম্যান্স আর্টিস্টদের অন স্টেজ ও ব্যাক স্টেজ জীবন তুলে ধরা অরুণকুমার মারিমুথুর ‘রেপ্লিকা আর্টিস্ট’, নারীর মাতৃত্বের সৌন্দর্য, পরিচয় নির্মাণের সামাজিক মাপকাঠিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া জ্যোতি শ্রেষ্ঠার ‘ছায়াকে’, আবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ক্যান ইউ টেল আ গ্রিন ফিল্ড’—নগরায়ণের প্রভাব তুলে ধরে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তিনি তার কাজে, কী দরকার একা হয়ে দলবদ্ধ বাঁচার?

বাস্টিন বেটজ তার ফটোস্টোরিতে তুলে ধরেছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে টিকে থাকা সিকিমের জনজীবন, রতীশ সুন্দরের ‘ম্যারি অ্যান্ড সাকো স্টিফেন’ নামের দম্পতির নিজেদের সংস্কৃতি, স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকার গল্প যেন মানুষের অস্তিত্ব সংকটকে প্রকট করে তোলে। লেসলি মেজিয়া তার গল্পে তুলে ধরেছেন ‘আওজান’ নৃগোষ্ঠীর নারীদের কঠিন জীবন। শাশ্বত দাশ তার ছবির গল্পে তুলে ধরেছেন পুরুলিয়ার ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি।

আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি শুধু শিল্পের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি স্মৃতি, পরিচয়, ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের গভীর অনুসন্ধান। এর প্রতিটি ছবি একেকটি অদৃশ্য গল্প বলে। এ প্রদর্শনী প্রমাণ করে, শিল্প কেবল দৃশ্যমান বাস্তবতা নয়, এটি এক নীরব ভাষা; যা বলে দেয় না বলা কথা, জাগিয়ে তোলে নিভে যাওয়া আলো।