কিছু সুর, পরিচিত ছন্দ হঠাৎই নিয়ে যেতে পারে পুরনো কোনো সময়ে। শৈশবের কোনো বর্ষণমুখর বিকাল ফিরে আসে, হারিয়ে যাওয়া কোনো মুখ আবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বহু দশক ধরে বলিউড তার সংগীত ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে এ স্মৃতি আর সুরের নিবিড় সম্পর্কের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এক সাড়া জাগানো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বলিউড যেন নিজের অতীতকেই নতুন করে ফিরে দেখতে শুরু করেছে জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্যায়নের মাধ্যমে। পুরনো গানগুলো ফিরে আসছে নতুন ছন্দে, ভারী বিটে, ঝলমলে ভিজুয়ালে। শিল্পের ভাষায় একে বলা হয় ‘রিক্রিয়েশন’। দর্শকের কাছে এগুলো পরিচিত রিমেক গান হিসেবে।
১৯৮০ সালের ‘লায়লা ম্যায় লায়লা’ গানটি নতুন রূপে ফিরে এল ২০১৭ সালে ‘রেইস’ সিনেমার মধ্য দিয়ে, কিংবা ১৯৯০ সালের ‘তাম্মা তাম্মা এগেইন’ শোনা গেল ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বদ্রীনাথ কি দুলহানিয়া’ সিনেমায়, তখন দর্শক ফিরে গিয়েছিল পুরনো দিনে। এ আধুনিক রিমেক গানগুলোর উদ্দেশ্য নতুন কিছু শেখানো ছিল না। বরং স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিল, যা দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছে।
বলিউডে সুরের পুনরাবৃত্তি নতুন নয়। অতীতে অনেক সময় সুরকাররা নিজেদের পুরনো সুর নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন, কিংবা আঞ্চলিক ও লোকসংগীতকে হিন্দি চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেছেন। এগুলো ছিল প্রাকৃতিক শিল্প প্রক্রিয়া, বাজারকেন্দ্রিক কৌশল নয়। প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় চলচ্চিত্রের বাইরে। নব্বইয়ের দশক এবং দুই হাজারের শুরুর দিকে ডিজে-নির্ভর রিমিক্স সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পুরনো গান নতুন ইলেকট্রনিক বিটে নতুন দৃশ্যায়নে ফিরে আসে, বিশেষ করে শহুরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। বলিউড এ পরিবর্তনকে প্রথমে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর ধীরে ধীরে আত্মস্থ করে।

২০১০-এর দশকের শুরুতে রিমেক গান চলচ্চিত্রে ঢুকতে শুরু করলেও ২০১৩ সালের পর এ প্রবণতা এক নতুন রূপ নেয়। ২০১৭ সাল নাগাদ এটি এক সুসংগঠিত ধারা হয়ে দাঁড়ায়। চলচ্চিত্রের অ্যালবামে রিমেক গান যেন বাধ্যতামূলক উপাদানে পরিণত হয়। পুরনো জনপ্রিয় গানের সুর রেখে, তার সঙ্গে আধুনিক সংগীতায়োজন, দ্রুতগতির ছন্দ এবং আকর্ষণীয় ভিজুয়াল যোগ করে নতুনভাবে পরিবেশন করা হয়। নেহা কক্করের কণ্ঠে ‘দিলবার’ ও ‘আঁখ মারে’-র মতো গান শুধু জনপ্রিয় হয়নি, ডিজিটাল প্লাটফর্মে একপ্রকার আধিপত্য বিস্তার করেছে।
এ প্রবণতাকে বোঝার জন্য শিল্পের বাইরে অর্থনীতির দিকে নজর দিতে হয়। চলচ্চিত্র একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ। প্রতিটি গান, প্রতিটি সুর একটি অনিশ্চয়তার অংশ। এ বাস্তবতায় পরিচিত সুর এক ধরনের নিরাপত্তা এনে দেয়। একটি জনপ্রিয় পুরনো গানের সঙ্গে থাকে আগেই তৈরি হয়ে থাকা শ্রোতাগোষ্ঠী, আবেগের তাৎক্ষণিক সংযোগ এবং বিপণনের সহজ পথ। ডিজিটাল যুগে এ সুবিধা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাই এটি কেবলই নস্টালজিয়া নয়, একটি সুপরিকল্পিত কৌশলও বটে।
এ রিমেক কালচারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশকিছু নাম। তাদের মধ্যে কম্পোজার তানিষ্ক বাগচি অন্যতম প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। বাদশাহ পুরনো সুরে র্যাপের সংযোজন ঘটান, নেহা কক্কর হয়ে ওঠেন এ ধারার এক পরিচিত কণ্ঠ। পাশাপাশি ‘টি-সিরিজ’-এর মতো
বড় মিউজিক লেবেল এ গানগুলোর প্রসার ও জনপ্রিয়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে এ রিমেক গান যতই বাড়তে থাকে, ততই কমতে থাকে নতুন সৃষ্টি। ২০১০-এর দশকের শেষের দিকে এ প্রবণতার বিরুদ্ধে অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দর্শকের একাংশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একই ধরনের গান, একই কৌশল সবকিছু যেন পূর্বানুমেয় হয়ে উঠেছে। সমালোচকরা বলেন, এটি সৃজনশীল স্থবিরতার লক্ষণ। শিল্পীরা নিজেরাও বুঝতে শুরু করেছেন, অতীতকে বারবার পুনরাবৃত্তি করা যায় না।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। আবারো গুরুত্ব পাচ্ছে মৌলিক সুর, অর্থবহ কথা এবং নতুন সৃষ্টির প্রয়াস। যদিও রিমেক গান পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তবে তার আধিপত্য কিছুটা কমেছে। বলিউডের এ রিমেক যুগ সাফল্য, না ব্যর্থতা এর উত্তর সরল নয়। একদিকে যেমন বাণিজ্যিকভাবে সফল, ডিজিটাল যুগে কার্যকর এবং ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ ধারা। তেমনি সৃজনশীলতার সীমাবদ্ধতা, মৌলিকতার অভাব এবং আবেগের ক্ষয়ও এনেছে। এ যুগকে একটি পর্ব হিসেবেই দেখা যায়। একটি সন্ধিক্ষণ, যেখানে বলিউড তার অতীত আর বর্তমানের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে ফিরছে।










