ভারতের ওয়েব সিরিজগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তম ‘পঞ্চায়েত’। টিভিএফের ব্যানারে ২০২০ সালে এসেছিল এর প্রথম সিজন। আসার পর পরই ফুলেরার প্রতি দর্শকের একটা ভালো লাগা কাজ করেছিল। শহুরে উচ্চাভিলাষী অভিষেক ফুলেরায় এসেছিল পঞ্চায়েত সচিবের চাকরি নিয়ে। তারপর গ্রামের অদ্ভুত সব মানুষ, নানা দ্বন্দ্ব তথাপি তাদের সহজেই আপন করে নেয়ার স্বভাব, অভিষেকের দর্শন বদল ইত্যাদি নিয়ে এগিয়েছিল প্রথম সিজনের গল্প। চমৎকার স্ক্রিপ্ট, সংলাপ আর সাদামাটা লোকেশনেও সিরিজটি দর্শক পছন্দ করেছিল এর সারল্যের জন্য। দ্বিতীয় সিজনেও তা ছিল, কিন্তু চতুর্থ সিজনে এসে সেই সারল্য হারিয়ে ফেলল সিরিজটি।

আগে থেকেই বোঝা গিয়েছিল ফুলেরায় এবার নির্বাচন নিয়ে জটিলতা হবে। হলোও তাই। ভূষণ আর প্রধানের মধ্যে নানা দ্বন্দ্ব হলো। তৃতীয় সিজন শেষ হয়েছিল অভিষেকের মামলায় জড়ানো নিয়ে। সেখান থেকেই গল্প শুরু হয়। মামলা থাকলে অভিষেক তার ক্যারিয়ারে এগোতে পারবে না। তাই মামলা তুলে নিতে সে ভূষণের কাছে যায়। ভূষণ দেয় নানা শর্ত। এর মধ্যে ঢুকে পড়ে বিধায়কও। শেষ পর্যন্ত মামলা আর তোলা হয় না। এর মধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণা চলতে থাকে। তা মাঝে মাঝে নোংরা রাজনীতিতেই চলে যায়।

পঞ্চায়েতের এবারের সিজন পুরোটাই গ্রামীণ ও গ্রাম্য রাজনীতি নিয়ে। সিরিজে দেখা যায় ভূষণ ও ক্রান্তি দেবী মিলে মঞ্জু দেবীকে নানাভাবে ছোট করার চেষ্টা করে। মঞ্জু দেবী ও প্রধানও চেষ্টা করে ভূষণদের টেক্কা দিতে। কিন্তু এবার কোনোভাবেই ভূষণকে টেক্কা দেয়া যায় না। ভূষণও প্রয়োজনে নিজেই নিজের মাথা ফাটিয়ে প্রধানকে ছোট করার চেষ্টা করে। প্রয়োজনে নিজের সমর্থককে প্রধানদের বাড়ির সামনে বসিয়ে রাখে গুপ্তচরবৃত্তি করার জন্য। বিকাশের স্ত্রীর সঙ্গে প্রহ্লাদকে জড়িয়ে নোংরা কথা ছড়ায়। প্রধান ও তার পরিবারও চেষ্টা করে সেসব এড়িয়ে নিজেদের কাজ করতে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হয় এবং তার একটা ফলও আসে, যা হয়তো সিরিজ দেখতে দেখতে দর্শক অনুমান করে নিতে পারেন সহজেই।

ভারতীয় ওয়েব সিরিজের একটা অন্যতম সমস্যা পরিমিতিবোধের অভাব। সেই সঙ্গে সিজনের পর সিজন চালিয়ে ব্যবসা করার ইচ্ছা তো ওটিটি প্লাটফর্মের থাকেই। এ দুই জায়গার প্রথমটিতে ব্যতিক্রম ছিল টিভিএফের নির্মাণে আসা পঞ্চায়েত। ভারতের যেকোনো ওয়েব সিরিজের মধ্যে দর্শক-পছন্দের ক্ষেত্রে এটিই এগিয়ে। কিন্তু চতুর্থ সিজনে এসে সিরিজটি এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হারিয়ে ফেলল। পঞ্চায়েতের মূল শক্তি ছিল সারল্য। সেটা গ্রামের মানুষকে আলাভোলা দেখানোর আরোপিত সারল্য নয়, বরং সরল গল্প সরল করে বলার সারল্য। এ সিজন সেখান থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে। মনে হলো, একটা সিজন বানাতে হবে বলেই বানানো। সচিব, মঞ্জু দেবী, প্রহ্লাদ, বিধায়ক সবাই নিষ্প্রভ।

পঞ্চায়েতের শক্তির অনেকগুলো জায়গা অবশ্য এবারো আগের মতোই আছে। চার সিজন মিলিয়ে বলা যায়, পঞ্চায়েতের মতো প্রতিটি চরিত্রকে বেড়ে ওঠার সুযোগ আর কোনো সিরিজে দেখা যায় না। অভিষেককে দিয়ে শুরু হলেও প্রথম সিজনে প্রধান ও প্রধানপত্নী স্বমহিমায় এসেছেন। এরপর প্রহ্লাদ, বিকাশ। তৃতীয় ও চতুর্থ সিজনে ভূষণ ও ক্রান্তি দেবী সে কারণেই অনেকটা আলো কেড়ে নেন। সারল্যের অনেকটা জায়গা সে কারণে হারিয়েও থেকে গেছে।

নির্বাচনী কোন্দল, সংসদ সদস্যের কাছ থেকে বিধায়ক হওয়ার প্রস্তাব মেনে নেয়ার মধ্য দিয়ে খুব যে রাজনীতি দেখানো হলো, তা কিন্তু নয়। ওখানেও প্রহ্লাদের সারল্য আছে। সততা আছে। গ্রাম পঞ্চায়েত বা আমাদের দেশে চেয়ারম্যান ইলেকশনে অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি জটিলতা হয়। সে জটিলতায় ঢোকা যেত। তাহলে অন্য গতি পেত সিরিজটা। নির্মাতা চাননি। তারা ফুলেরার সারল্য রেখে নির্বাচন ও রাজনীতির জটিলতা দেখাতে চেয়েছেন। সেটা করার কারণে পঞ্চায়েত সিরিজের গল্প ও চরিত্রের সারল্য আগের চেয়ে কমলেও এখনো তা আছে। তবে তা সব দর্শকের পছন্দ না-ও হতে পারে। যদিও পঞ্চায়েতের তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে এটি নিয়ে নেতিবাচক কথা কমই আসছে, কিন্তু আরেকটা সিজন বানাতে হবে বলে এ সিজন বলির পাঁঠার মতো হয়ে গেল।

মনে থেকে যাওয়ার মতো কোনো সংলাপ, কোনো দৃশ্য নাই বললেই চলে। আপনা থেকে হেসে ওঠার মতো কয়েকটা জায়গা আছে, তবে রেশ বেশিক্ষণ থাকে না। কিন্তু এ সিজনে বিনোদ আপনার মনোযোগ নেবে। মন জয়ও করতে পারে। প্রধানের বাড়িতে খেয়ে ওঠে, ‘আমি গরিব কিন্তু গাদ্দার নই’-কে অনেকে এগিয়ে রাখতে পারেন। তবে সিনেমার শেষে নির্বাচনের খবর পাওয়ার পর থেকে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দৌড়ের সময়ে অশোক পাঠকের (বিনোদ) সম্ভবত তার জীবনের সেরা কাজের একটা হয়ে থাকবে।