কম্বোডিয়ার শিল্পী ভ্যানডা মান। এই কিছুদিন আগে তিনি পারফর্ম করলেন প্যারিস অলিম্পিকে। বিশ্বের সেরা শিল্পীদেরও সবার ভাগ্য হয় না এমন প্লাটফর্ম পাওয়ার। কিন্তু ভ্যানডা পেয়েছেন। তার জন্য খেটেছেন দিনরাত। ঝুঁকি নিয়েছেন। সংগীতকেই একমাত্র প্যাশন ধরে এগিয়েছিলেন আর তার ফলেই পৌঁছতে পেরেছেন উচ্চতায়। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের কাছে নিজের পাশাপাশি খেমার (কম্বোডিয়ার ভাষা) সংগীতকে নিয়ে গেছেন।

ভ্যানডা মানের জন্ম ১৯৯৭ সালে কম্বোডিয়ার সিহানোকভিলে। বাবা-মা ছিলেন নারকেল ব্যবসায়ী। সিহানোকভিলেরই একটা স্থানীয় বাজারে তারা ব্যবসা করতেন। সে সাধারণ পরিবারের মধ্য থেকেই ভ্যানডা সংগীতের প্রতি ঝুঁকেছিলেন। জীবনে ভুল পথে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তার ভাষ্যমতে, সংগীতই তাকে আলোর পথ দেখিয়েছে। কানিয়ে ওয়েস্ট তার অন্যতম প্রিয় শিল্পী।

11

বাবা-মাকে ছেড়ে আজ থেকে ছয় বছর আগে অনিশ্চিতের পথে পা বাড়িয়েছিলেন ভ্যানডা। এর আগে ২০১৬-১৮ সালের মধ্যে তিনি বেশকিছু সিঙ্গেল গান মুক্তি দেন। মূলত অনলাইন দুনিয়ায় নিজে নিজেই খানিকটা এগিয়েছিলেন তিনি। এরপর একদিন একটা ট্যাক্সিতে চড়ে পরিবার পেছনে ফেলে সংগীত খুঁজতে বের হলেন তিনি। বয়স তখন মেরেকেটে ২১। এ নিয়ে গণমাধ্যম ভাইসকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল নিজের স্বপ্নকে খুঁজতে বেরোনোর সময় হয়েছে। আমি এমন একজন মানুষ যে সংগীতকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। ছেলেবেলা থেকেই সংগীতের সঙ্গে বসবাস করেছি। সবখানে গিয়েছি সংগীতের সঙ্গে। এখন ভালো লাগে এটা ভেবে, যা ভালোবাসি তার জন্য ছুঁটতে পেরেছিলাম।’

খুব সহজ ছিল না যাত্রা। প্রথমে লড়তে হয়েছে পরিবারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার চেয়েছিল আমি ডাক্তার বা আইনজীবী হই। আমি চাইনি। তাই নম পেনে চলে যাই। নিজের ভেতরকার ডাকটা স্পষ্ট করে শুনতে। এভাবেই একদিন ভ্যানডা হয়ে উঠি।’

তিনি আরো বলেন, ‘তারা ভেবেছিল আমি এখানে বেশিদিন থাকতে পারব না। কিন্তু আমি নিজেকে গড়ে তুলেছি। কখনো আর ফিরে যাইনি।’

ভ্যানডার বহু ভক্ত আছে কম্বোডিয়ায়। কিন্তু তিনি সেখানকার অন্য শিল্পীদের চেয়ে ভিন্ন। ভ্যানডার মুখে ট্যাটু আছে, কম্বোডিয়ানদের মধ্যে এ চল কম। এছাড়া সেখানে কভার আর্টিস্টরাই জনপ্রিয়। কিন্তু ভ্যানডা নিজেই মৌলিক গান তৈরি করেন। আর তার জনরা হিপহপ।

২০২১ সালে টাইম টু রাইজ দিয়ে আলোচনায় আসেন ভ্যানডা মান। এ গানে তিনি হিপহপের সঙ্গে কম্বোডিয়ার এতিহ্যবাহী সংগীতের ফিউশন করেন। এতে তিনি ফিচার করেন ৭৮ বছর বয়সী মাস্টার কং নেয়কে। তিনি খেমার রুজ গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া অল্প কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে একজন। মাস্টার কং নেয় ‌এখনো ‘‌চাপেই ডাং ভেং’ নামে কম্বোডিয়ার এতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রটি বাজান। ‘‌টাইম টু রাইজ’ ইউটিউবে এখন পর্যন্ত ১২ কোটির বেশি ভিউ পেয়েছে। মোবাইল কোম্পানির ক্যাম্পেইনের জন্য লেখা গানটি ভ্যানডার ক্যারিয়ারের মাইলফলক হয়ে উঠেছে। তাকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। আর কম্বোডিয়ার ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি এ গানকে অমূল্য মনে করেন ভ্যানডা। কং নেয়র চিকিৎসার জন্য ভ্যানডা ২০২২ সালে ২৫ হাজার ডলার খরচ করেছেন। একই বছর প্রকাশ পায় তার চতুর্থ অ্যালবাম ‘স্কাল টু: সিজন ওয়ান’।

২০২২ ও ২০২৩ সালে ‘লিফটেড এশিয়া’র হিসাবে এশিয়ার সেরা ৫০ শিল্পীর তালিকায় এসেছেন ভ্যানডা। কম্বোডিয়াকে তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বিশ্বের কাছে। খেমারদের ভাষা ও সংগীতও নিয়ে গেছেন বিশ্বমঞ্চে। প্যারিস অলিম্পিকে তাই তার দিকে নজর ছিল বিশ্বের। তিনি গেয়েছিলেন ইংরেজি ও খেমারে। টাইম টু রাইজ দিয়ে তিনি দর্শক মাতিয়েছিলেন আর প্যারিস চিনেছিল এশীয় এক শিল্পীকে। মঞ্চে গান গাওয়ার আগে ভ্যানডা শ্রদ্ধা জানান কম্বোডিয়ার সংগীত ও ঐতিহ্যকে।

খেমার সংগীত ঠিক পথেই আছে বলে মনে করেন ভ্যানডা। তিনি বলেন, ‘আমাদের থেমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিটা প্রজেক্টে আমি নিজের শতভাগ সামর্থ্য দিয়ে কাজ করি। খেমার সংগীতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই এভাবেই।’

এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক ও ভাইস অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান