‘সাহস’-এর ধারাবাহিকতায় আবারো ভিন্ন আঙ্গিকে পর্দায় ফিরছেন অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। এবারো দক্ষিণের মানুষ, তাদের জীবন আর ভাষার গল্প নিয়ে হাজির হচ্ছেন তিনি। সিনেমার রহস্যময় প্রথম পোস্টার প্রকাশের পরই শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড়। নতুন সিনেমা ও অন্যান্য বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান।

সম্প্রতি আপনার ফেসবুকে একটা রহস্যময় পোস্টার দেখেছি—লাল আলখাল্লা পরা একজন মানুষ পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু বলবেন, বিষয়টা আসলে কী?

সিনেমার প্রচারণার অংশ হিসেবে এ পোস্টার। এর আগে একটা এলাকার আবহ বুঝিয়ে প্রথম অ্যানাউন্সমেন্ট পোস্টার দেয়া হয়। সিনেমার নাম দুঃসাহস। এটি ‘সাহস’-এর পরের গল্প। প্রথম অ্যানাউন্সমেন্ট পোস্টার অনুযায়ী ‘একটা লোকালয়’, আর দ্বিতীয় পোস্টার অনুযায়ী ‘রহস্যময় কেউ’। এভাবে আমরা আরো বেশকিছু পোস্টার দেব। প্রতিটা পোস্টারের ছবিই একটা ক্লু—এক ধরনের ফটোগ্রাফিক টিজার বলতে পারেন।

এ সিনেমার গল্পটা কী নিয়ে?

সাহস যেখানে শেষ হয়, দুঃসাহস সেখানে শুরু। এটা ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের গল্প—লোকাল ক্রাইম অ্যাকশন থ্রিলার। সিটি অব গড কিংবা গ্যাংস অব ওয়াসেয়পুর এ জনরার উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারেন।

‘দুঃসাহস’ নামটার পেছনে কোনো বিশেষ ভাবনা বা প্রতীকী অর্থ আছে কি?

অবশ্যই আছে। প্রতিটা নামের পেছনে একটা বিশেষ ব্যাপার তো থাকেই, এখানেও তাই। সাহস যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন কেন নামটা ছিল সাহস। এবার দুঃসাহস যারা দেখবেন, আশা করি বুঝে যাবেন কেন নাম দুঃসাহস।

‘দুঃসাহস’ কি ‘সাহস’-এর সিকুয়াল নাকি সম্পূর্ণ নতুন কিছু?

আগেই বলেছি, সাহসের পরের গল্প দুঃসাহস। তবে এবার আরো নতুন নতুন লেয়ার যুক্ত হয়েছে গল্পে। নতুন নতুন ক্যারেক্টর এসেছে। মীর রাব্বি, এলিনা শাম্মী, ইমেল হক—এ দারুণ গুণী মানুষরা অসাধারণ চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করেছেন। দুঃসাহসে আগের গল্পের সঙ্গে কানেকশন পাবেন, আবার একটা নতুন গল্পও দেখবেন।

শোনা যাচ্ছে সিনেমাটি দক্ষিণ বঙ্গে নির্মিত। এ অঞ্চলকেন্দ্রিক গল্প বলার কারণটা কী?

একদম সঠিক। এটা দক্ষিণ বঙ্গে, বাগেরহাটে নির্মিত। কাস্ট, ক্রু ও টিমের বেশির ভাগই এখানকার। আমরা যত মৌলিক গল্প বলতে পারব—আমাদের লোকালিটি, ফোক, ট্র্যাডিশন, দেশপ্রেম, সংস্কৃতি নিয়ে সিনেমা বানাতে পারব—তত আমরা বিশ্বে স্বকীয়তা অর্জন করব।

অঞ্চলে শিল্পের চর্চা না হলে নেগেটিভিটি গ্রাস করবে মনন ও মস্তিষ্ক।

স্থানীয় ভাষা বা সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার সময় কি কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন?

সাহস করার সময় বেশি চ্যালেঞ্জ ছিল। নিজের এলাকায় আগে কখনো শুটিং হয়নি। আমাদের ওখানে ২০ বছর ধরে শিল্পকলার চর্চা ধীরে ধীরে ধ্বংস করা হয়েছে। না ভবন আছে, না অনুশীলন। তবে এবার দুঃসাহসের সময় টাকার জোগাড় ছাড়া তেমন বড় কোনো চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হয়নি। পরিচালক কৌতূহলসহ তার টিম, শিল্পীরাও একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করেছে।

দক্ষিণ বঙ্গ থেকে সিনেমা বানাতে গেলে প্রযোজনা বা লোকেশনসংক্রান্ত কী কী বাস্তব সমস্যা সামনে আসে?

ইনভেস্টর যদি সৎ পাওয়া যায়, তাহলে দক্ষিণ বঙ্গ থেকে সিনেমা বানাতে আর কোনো অসুবিধা নেই। আমি ইনভেস্টরদের আহ্বান করব—আসুন, আমাদের সঙ্গে বসুন, ইনভেস্ট করুন। এখানে হল বানাই, সিনেমা বানাই, থিয়েটার করি, ব্যান্ড বানাই, প্যানেল-স্টুডিও বানাই। পুরো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা সম্ভব টাকা থাকলে।

প্রতিটি এলাকায় প্রচুর ট্যালেন্ট আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যার টাকা আছে সে কাজ জানে না; আর যারা কাজ জানে, তাদের টাকা নেই বা লবিংও নেই।

আপনি প্রায়ই ইন্ডাস্ট্রির বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন। বিষয়টা নিয়ে আপনার ভাবনা যদি আরেকটু পরিষ্কার করতেন?

দেখেন আজ আপনি যেটা করছেন সেটা যদি আপনার জন্মস্থানেই বাড়ির গরম ভাত খেয়ে করতে পারতেন, তাহলে আপনি ঢাকায় থাকতেন না। প্রতিটা জেলায় যদি একটা অ্যাকটিভ শিল্পকলা থাকে, যেখানে সব শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা হয়, একটা সিনেপ্লেক্স থাকে, একটা কালচারাল হাব থাকে, এডিট প্যানেল, সাউন্ড, ক্যামেরা থাকে—তাহলে মানুষ কেন এ দূষিত, ভিড়ভাট্টার শহরে থাকবে?

আমার স্বপ্ন জন লেননের ইমাজিন গানের মতো। এ দেশের ঘরে ঘরে আবার রেওয়াজের শব্দ শুনব, তবলার তাল শুনব, নদীর পাড়ে ছেলেমেয়েরা পেইন্টিং করবে, এক্সিবিশন হবে, আর্ট ক্যাম্প হবে, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হবে, বই উৎসব হবে, মাঠে ছেলেমেয়েরা খেলবে, ভ্রমণ করবে, জানবে, শিখবে, জ্ঞানী হবে।

আমাদের এখানে এখনো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি। ইন্ডাস্ট্রি হতে হলে প্রতিটা জেলায় সিনেপ্লেক্স থাকতে হবে, সারা বছর ভালো সিনেমা চলতে হবে। দর্শক টিকিট কেটে ঠিক করবে কোনটা চলবে।

সাংস্কৃতিক ঐক্য ও বিপ্লব মাস্ট। তাহলেই ইন্ডাস্ট্রি হবে। সবাই মিলে সেটা গড়তে হবে। আমরা ভাঙার জাতি, গড়তে সময় লাগবে। আমরা অসম্মান করতে ভালোবাসি, সম্মান শিখতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।

তাই বলি ঢাকায় যেতে হবে না। ঢাকা থেকেই সবাই যাবে যেখানে কাজ হবে। এত ছোট শহরে আর চাপ না দেয়াই ভালো। প্রতিটা এলাকায় ইনভেস্টর ও প্রোডিউসার তৈরি হতে হবে, ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস থাকতে হবে। শিল্পকলা নামে আছে, কামে নাই।

আপনার কাজের মধ্যে দেখা যায় আপনি লোকাল গল্পকে অনেক গুরুত্ব দেন। আপনি কি মনে করেন এ ধরনের গল্প এখনকার দর্শক বেশি গ্রহণ করছে?

লোকাল গল্প সারা বিশ্বেই দর্শক বেশি গ্রহণ করে। আমরা অনেক পরে এসে এর চর্চা শুরু করেছি। বাইরের দেশে শিল্পী ও শিল্পচর্চাকে প্রাধান্য ও সম্মান দেয়া হয়, লোকাল শিল্পীকেও সম্মান করা হয়। আমাদের সে চর্চা নষ্ট হয়েছে।

আগে শিল্পীকে খুঁজে তার বায়না দিয়ে আসতে হতো, এখন সে ঐতিহ্য হারিয়েছে।

জনসাধারণের গল্প বলতে হবে। ধার করা বা নকল গল্প কেন বানাতে হবে?

সব ধরন ও জনরার কাজ হতে হবে। কাস্টিং গল্প অনুযায়ী হবে, গল্প কাস্টিং অনুযায়ী না। যাদের গল্পে দম নেই, তারা বলে ‘এই কাস্টিং না হলে বিক্রি হবে না’। কিন্তু ভালো গল্পে দম থাকলে নির্দিষ্ট কাস্টিং লাগে না।

তাই আমি সবসময় বলি, ‘‌ভালো কাহিনী আর ভালো বাহিনী’—এ মিলেই হয় একটা ভালো কাজ। শুধু লোকাল গল্পই নয়, সব জনরার গল্প করতে চাই। অভিনয় তো মরার আগ পর্যন্ত করতে চাই। লোকাল গল্পে প্রাণ বেশি পাই বলে হয়তো বেশি করি—বিশ্বাসযোগ্যতাও বেশি হয় বোধহয়।