বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (ডিআইএফএফ)। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এবারের উৎসবের পর্দা ওঠে। দেশী ও বিদেশী চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণ পরিণত হয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক মিলনমেলায়।

উদ্বোধনী দিনের আয়োজনের অংশ হিসেবে জাতীয় জাদুঘরের দুটি অডিটোরিয়ামে একযোগে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রধান অডিটোরিয়ামে প্রদর্শিত হয় চেন শিয়াং পরিচালিত ‘উ জিন ঝি লু’ (দ্য জার্নি টু নো এন্ড)।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সাংস্কৃতিক বিনিময়কে সামনে রেখে জাতীয় জাদুঘরে চীনা চলচ্চিত্রবিষয়ক একটি বিশেষ প্রদর্শনী কর্নারের উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া জলতরঙ্গ থিয়েটার কোম্পানির একটি থিয়েট্রিক্যাল পরিবেশনাও উপভোগ করেন অতিথিরা।

8

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল উৎসবের দর্শন তুলে ধরে বলেন, ‘ভালো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভালো দর্শক তৈরি হয় আর সেই দর্শক থেকেই গড়ে ওঠে একটি উন্নত ও সচেতন সমাজ।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের কালচার কাউন্সিলর লিই শাওপেং এ আয়োজনকে চীনা চলচ্চিত্র সপ্তাহ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি চলচ্চিত্রকে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং পারস্পরিক সাংস্কৃতিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ অতিথি ক্রোয়েশিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা আলেকজান্দ্রা মার্কোভিচ বলেন, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গল্প বলার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; পানি সম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে চলচ্চিত্রের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী চাপ, হতাশা ও সামাজিক উত্তেজনার মতো বিষয় মোকাবেলায় মানুষকে সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত করে এবং মূল্যবোধ, জ্ঞান ও সংস্কৃতি ভাগাভাগিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’

10

রিজওয়ানা হাসান জানান, এ চলচ্চিত্র উৎসব যেন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না থেকে ঢাকার বাইরের শহরগুলোয়ও ছড়িয়ে যায়। আগামী আয়োজনগুলোয় উৎসবকে আরো বিস্তৃত পরিসরে নেয়ার প্রত্যাশার কথাও বলেন তিনি।

পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, এবারই প্রথম কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ওপেন এয়ার স্ক্রিনিং। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত আমাদের কক্সবাজার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমুদ্রতটে চলচ্চিত্র উৎসব হয়, এবার সে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশেও যুক্ত হলো।’

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে স্পন্সর পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আয়োজকরা স্পন্সর সংকটে ভোগেন, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে চলচ্চিত্র উৎসবগুলো ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে চলচ্চিত্র উৎসবে স্পন্সর পাওয়া যায় না।’

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সাফল্য নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন।

এ বছর ১০-১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এবারের আসরে বিশ্বের ৯১টি দেশ থেকে নির্বাচিত মোট ২৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে। স্বাধীন, আন্তর্জাতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে এ উৎসব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃজনশীলতা, সামাজিক সংকট ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

উৎসবটি ঢাকা ও কক্সবাজারের একাধিক ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে। ভেন্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকা, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, থ্রিডি আর্ট গ্যালারি, ভিনটেজ কনভেনশন হল ও কক্সবাজারের লাবণী সৈকত।

চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিশিষ্ট অতিথি ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়। এ আয়োজন আগামী দিনগুলোর জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক সূচনা তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশী দর্শকের কাছে বিশ্ব চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকে আরো কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।