ভারতে একবার জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেন। চলেছিল দুই বছর। এ সময় জরুরি অবস্থার প্রভাব পড়েছিল ভারতের সিনেমায়। আমৃত নাহাথা পরিচালিত রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক ছবি ‘কিসসা কুরসি কা’ তখনকার দমননীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধীর শাসনের সমালোচনা করায় এ ছবির ৫১টি দৃশ্য কেটে দেয়া হয় এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ভিসি শুক্লার নির্দেশে ছবির সব কপি পুড়িয়ে ফেলা হয়।
১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসে জনতা পার্টি। তখন নাহাথা আবার সিনেমাটি তৈরি করেন। জরুরি অবস্থা উঠে গেলেও দ্বিতীয় নির্মাণেও সেন্সর বোর্ড তাকে ছাড় দেয়নি। এ প্রসঙ্গে নাহাথার ছেলে ২০১৫ সালে বলেছিলেন, ‘ক্ষমতায় এলেই মানুষের মনোভাব বদলে যায়। সত্যকে কখনই প্রকাশ্যে আসতে দেয়া হয় না।’
৫০ বছর পার হয়েছে ভারতে জরুরি অবস্থার। এর পরও সৃজনশীলতার ওপর একই ধরনের দমননীতি বজায় আছে। মজার ব্যাপার হলো বর্তমান বিজেপি সরকার ২৫ জুনকে ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ পালন করতে চায়, কিন্তু নিজেরাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হেনে চলেছে। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে তারা কোনো ছাড় দিচ্ছে না।
বর্তমানে সিনেমা সংরক্ষণ করা হয় ডিজিটাল ফরম্যাটে। তাই সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর সত্যকে দমন করার উপায় এখনো অগণিত। বিজেপি শাসিত সরকারের অধীনে কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড (CBFC) এমন সব বিষয়কে নিশানা করছে, যা ‘দেশবিরোধী’ বা সরকারের সমালোচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সম্প্রতি এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা এ অবস্থার প্রতি নির্দেশ করে। আমির খান অভিনীত সিতারে জমিন পার সিনেমায় ‘কমল’ শব্দটি বাদ দিতে বলা হয়েছে, কেননা এটি বিজেপির প্রতীক। এছাড়া ২০৪৭ সালের মধ্যে শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত গড়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি এ সিনেমায় সংযুক্ত করতে বলা হয়।
একইভাবে জানকী ভার্সেস স্টেট অব কেরালা ও টোকেন নাম্বার নামের দুটি মালয়ালম সিনেমার চরিত্রের নাম ‘জানকী’ হওয়ায় তা সেন্সরের মুখে পড়ে। উল্লেখ্য, জনকরাজের কন্যা হিসেবে জানকী হলো সীতার আরেকটি নাম। তাই তা হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ। সিনেমা দুটো থিরুভানন্তপুরমের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে অনুমোদিত হয়েছিল, কিন্তু মুম্বাইয়ের পুনর্বিবেচনা কমিটি এগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে।
২০২১ সাল পর্যন্ত CBFC-এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য তিন স্তরের একটি ব্যবস্থা ছিল। এর শীর্ষে ছিল ফিল্ম সার্টিফিকেশন আপিলেট ট্রাইব্যুনাল। সরকারের এ ট্রাইব্যুনালটি তুলে দেয়ার কারণে এখন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একমাত্র আশ্রয় আদালত। কিন্তু তা একদিকে সময় ও অন্যদিকে বিপুল ব্যয়সাধ্য।
এ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পাঞ্জাব ’৯৫ নামের সিনেমায়। এটি মানবাধিকার কর্মী যশবন্ত সিং খালরার জীবনী অবলম্বনে তৈরি। ১৯৯০-এর দশকে পাঞ্জাবে নিরাপত্তা বাহিনীর নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যার তদন্তে যুক্ত থাকা খালরাকে ঘিরে তৈরি সিনেমাটিতে পুলিশের নাম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের উল্লেখ বাদ দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া ১২০টিরও বেশি জায়গা বাদ দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্মাতারা বম্বে হাইকোর্টে আপিল করলেও এখনো চূড়ান্ত রায় হয়নি।
ভারতে সেন্সরশিপ বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত। এ চর্চা চলেছে ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে কংগ্রেস এবং অন্যান্য সরকার পর্যন্ত। দেখা যাচ্ছে, এখন তা আরো নিখুঁত ও পরিকল্পিত। বিশেষত যখন সিনেমার বিষয়বস্তু শাসক দলের মতাদর্শের বিরোধী হয়। স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলো আপাতভাবে স্বনিয়ন্ত্রিত হলেও তাণ্ডব বা তিসের মতো প্রজেক্ট প্রমাণ করেছে যে তাদেরও চাপের মুখে পড়তে হয়।
ইমার্জেন্সি চালু করলেও ইন্দিরা গান্ধী একসময় গরম হাওয়া (১৯৭৪) মুক্তির ক্ষেত্রে সেন্সরের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। এখন আর এমন কোনো ভারসাম্যকারী শক্তি নেই। আপিল ট্রাইব্যুনাল তুলে দেয়া ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতিতে নির্মাতারা বাধ্য হচ্ছেন আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ-সেন্সরশিপে’।
কয়েকজন পরিচালক সেন্সরশিপ নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। যেমন সাই পরাঞ্জপের কথায় (১৯৮২) একটি কৌতুক মাঝপথে থেমে যায় এবং পর্দায় “CENSORED” শব্দটি ভেসে ওঠে। এটি একটি তীব্র বিদ্রুপ। এখন এমন দৃশ্যকেও হয়তো বাদ দিতে বলা হতো।
ইমার্জেন্সির ৫০তম বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে অনেকেই বলছেন ইমার্জেন্সির সে দমননীতি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সাদৃশ্য বহন করে। আজকের দিনে সেন্সরশিপ শুধুই অতীতের এক শিক্ষা নয়—এটি বর্তমানের এক জীবন্ত বাস্তবতা। কিসসা কুরসি কার ভাগ্য মনে করিয়ে দেয়, সাহসী গল্প বলার জন্য এখনো নির্মাতাদের মূল্য দিতে হয়।
স্ক্রলডটইনে প্রকাশিত নন্দিনী রামনাথের নিবন্ধ অবলম্বনে










