বাংলাদেশের গানের ভুবনে আলিফ আলাউদ্দিন একটি পরিচিত নাম। সংগীতশিল্পী হিসেবেই নয়, উপস্থাপক হিসেবে টেলিভিশনেও দীর্ঘ সময় দ্যুতি ছড়িয়েছেন তিনি। অনেক আগেই সংগীত অঙ্গনে নিজের আলাদা একটা জায়গা করে নিয়েছেন। পেন্টাগন ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে কিংবা একক শিল্পী হিসেবে তার কাজ শ্রোতাদের কাছে বার বারই প্রশংসিত হয়েছে। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি ছিলেন গানের জগৎ থেকে কিছুটা দূরে। এ বিরতির পেছনে ছিল এক জটিল শারীরিক লড়াই, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট। সে অভিজ্ঞতা, ফিরে আসার প্রস্তুতি, গান নিয়ে ভাবনা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলিফ আলাউদ্দিন খোলামেলা কথা বলেছেন। তার এ ফেরার গল্প শুনেছেন অহিদুর রহমান
‘আমি কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করিয়েছি, নিজেকে সুস্থ করতে সময় লেগেছে।’
আলিফ বলেন, ‘আমার একটা লম্বা বিরতি গেছে। নিজেকে প্রস্তুত করতে সময় লেগেছে। এখনো সে প্রসেসে আছি। আমি অনেক দিন ধরেই অ্যালবাম করার কথা ভাবছিলাম। কারণ আমি মনে করি, একটি অ্যালবাম একটি সময়কে ধারণ করে। একটা গানে যতটা অনুভবের প্রকাশ হয়, তার চেয়ে অনেক বড় কিছু বলা যায় একটি অ্যালবামের মাধ্যমে। আমার বিরতির সময়টায় কীভাবে নিজেকে উপলব্ধি করেছি, তা নিয়েই গানগুলো সাজাচ্ছি।’
‘বাবা-মায়ের গাওয়া গান আবার করতে চাই’
নতুন গান নিয়ে তিনি বলেন, ‘গানগুলোয় চমক থাকবে কিনা জানি না, তবে আমি আমার মতো করে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করব। আমার বাবার কিছু পুরনো গান, যেগুলো মা গেয়েছিলেন—সেগুলোর একটি-দুটি আবার নতুন করে গাওয়ার চেষ্টা করছি। আমার নিজের লেখা কিছু গান রয়েছে, যেগুলো আমি আর আমার হাজবেন্ড সুর করেছি। অলরেডি কিছু স্ট্রাকচার দাঁড় করিয়েছি। কিছুদিনের মধ্যেই কাজের গতি আরো বাড়বে।’
‘বয়সের সঙ্গে বদলেছে চিন্তা, গানে তার প্রতিফলন থাকবে’
গানের কথায় ও সুরে নতুনত্ব আসবে কিনা জানতে চাইলে আলিফ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন হয়। আমি দীর্ঘদিন অ্যালবাম করিনি, তবে কিছু সিঙ্গেল গান রিলিজ হয়েছে। এর মধ্যে আমি বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছি। এ অভিজ্ঞতা আমার জীবনবোধ পালটে দিয়েছে। ফলে আমার জীবনের এসব অভিজ্ঞতা গানে প্রতিফলিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক।’
‘সিঙ্গেলের ভিড়ে আমি অ্যালবামের আনন্দ খুঁজে ফিরি’
যখন সবাই একক গান প্রকাশে ব্যস্ত, সেখানে অ্যালবাম করতে চাওয়ার পেছনে আলিফের যুক্তিটা স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘অ্যালবামের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। আমি নব্বইয়ের দশকে গান শুনে বড় হয়েছি। তখন একসঙ্গে অনেক গান শোনার যে আনন্দ ছিল, এখন সেটা নেই। সিঙ্গেল গান তো করেছি। ‘‘অপেক্ষা’’ নামে একটা গান রিলিজ করেছি, ‘‘কোথায় তুমি’’ (সুমন ভাইয়ের সঙ্গে) গানটি জনপ্রিয় হয়েছে। ‘‘বন্ধু তিন দিন’’ গানটিও সিঙ্গেল হিসেবে এসেছিল। তবে যেহেতু দীর্ঘ একটা বিরতির পর ফিরছি, তাই অ্যালবাম দিয়েই ফিরতে চাই।’
‘শুধু গান নয়, পড়াশোনাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ’
প্রশ্ন উঠতেই পারে—‘ইস্টিশনের রেলগাড়িটা’ গেয়ে জনপ্রিয় হওয়ার পরও কেন গান কম করলেন? আলিফ জানালেন, ‘তখন আমি নবম শ্রেণীতে পড়ি। এরপর ও লেভেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমি কখনো চাইনি শুধু গানে ডুবে থাকব। পড়াশোনা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই ফুল-টাইম গান করার সুযোগ বা ইচ্ছা ছিল না। আমি চেয়েছি সময় নিয়ে, ভালোভাবে গান করব। সেজন্য হয়তো গানের সংখ্যাটা তুলনামূলক কম।’
‘পেন্টাগন আবার গানে ফিরছে’
আলিফের ব্যান্ড পেন্টাগন নিয়ে অনেকেরই আগ্রহ আছে। নতুন কিছু কি আসছে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো প্র্যাকটিস করছি। সামনে আমাদের কিছু শো রয়েছে। পরিকল্পনা আছে, আগামী বছর নতুন কিছু গান রিলিজ করব।’
‘অসুস্থতা আমাকে নতুন করে জীবন চিনিয়েছে’
কিডনি সমস্যা ও চিকিৎসাজনিত অভিজ্ঞতা জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে—জানালেন আলিফ। তিনি বলেন, ‘ট্রান্সপ্লান্টের আগে ডায়ালাইসিস করতে হয়েছে। শুধু শরীরিক নয়, মানসিকভাবেও কষ্ট পেয়েছি। এখনো মাঝেমধ্যে ভয় পাই, আবার অসুস্থ হয়ে যাব না তো? আগে ভয় পেতাম নানা কিছুতে, এখন চেষ্টা করি কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। একটা সময় এতটাই অস্থির ছিলাম যে গান প্র্যাকটিসও ঠিকমতো করতে পারতাম না। আস্তে আস্তে নিজেকে সেখান থেকে বের করে আনছি।’
‘গান বদলেছে, শ্রোতাও বদলেছে, তবু ভালো গানের জায়গা আছে’
বর্তমান সংগীতাঙ্গনের পরিবর্তন প্রসঙ্গে আলিফ বলেন, ‘অনেক কিছুই বদলে গেছে। এখন অ্যালবামের চেয়ে সিঙ্গেল গানই বেশি হচ্ছে। তবে এখনো সব ধরনের গান হচ্ছে—আধ্যাত্মিক গান, আবার সস্তা লিরিকের গানও হচ্ছে। তবে সব ধরনের গানের শ্রোতা এখনো আছে। একজন শিল্পীর নিজের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা থাকাটাই মুখ্য।’
‘গায়কিতে নয়, কিন্তু মিউজিক স্টাইলে নতুন প্রভাব এসেছে’
আলিফ মনে করেন, গায়কির জায়গায় তিনি নিজের ধরনেই আছেন, তবে সংগীতায়োজনে নতুন প্রজন্মের ছোঁয়া এসেছে। ‘সাউন্ড, অ্যারেঞ্জমেন্টে বদল এসেছে। আমি চেষ্টা করি যেন আগের চেয়ে আরো ভালো গাইতে পারি।’
‘উপস্থাপনা আমার সংগীতজীবনের অংশ’
শুধু গানে নয়, উপস্থাপনায়ও আলিফ আলাউদ্দিন সফল। তিনি বলেন, ‘ট্রান্সপ্লান্টের পরও আমি ‘‘মিউজিক বাজ’’ অনুষ্ঠান করেছি, যা প্রায় ১২ বছর চলেছে। গত বছর অনুষ্ঠানটি শেষ করি। গানে বিরতি এলেও হোস্টিং চালিয়ে গেছি, এখনো করছি।’
আলিফ আলাউদ্দিন জীবন ও সুরের লড়াই একসঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। আবারো গান নিয়ে ফিরছেন, শ্রোতার জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক আশার খবর।










