‘মারিও বার্গাস ইয়োসার প্রস্থানে আত্মীয়, বন্ধু ও বিশ্বের নানা প্রান্তের পাঠকরা শোকাহত হবেন। তবে আমরা আশা করি, তারা এই ভেবে সান্ত্বনা পাবেন যে মারিও বার্গাস ইয়োসা দীর্ঘ, সাহসিকতায় ভরপুর ও ফলপ্রসূ জীবন কাটিয়েছেন এবং এমন এক সাহিত্যকীর্তি রেখে গেছেন যা তার মৃত্যুকেও অতিক্রম করবে।’ লাতিন সাহিত্যের কিংবদন্তি মারিও বার্গাস ইয়োসার মৃত্যুর খবর জানিয়ে এমনটাই বলেছিলেন তার তিন সন্তান।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সাহিত্য জীবনে মারিও বার্গাস ইয়োসা ক্ষমতা ও দুর্নীতির আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে একাধিক উপন্যাস লিখেছেন। দ্য টাইম অব দ্য হিরো, কনভারসেশন ইন দ্য ক্যাথেড্রাল বা দ্য ফিস্ট অব দ্য গোটের মতো কাজের আবেদন যে এখনো ফুরায়নি তা বলাই বাহুল্য। হয়তো আরো অনেককাল উপন্যাসগুলো সমসাময়িক হয়ে থাকবে।

পেরুভিয়ান এ ঔপন্যাসিককে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বৈশ্বিক জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ ধরা হয়। ১৩ এপ্রিল মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। মারিও বার্গাস ইয়োসার জীবনও ছিল তার লেখার মতোই রঙিন। পেরুর প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা লাতিন সাহিত্যের আরেক দিকপাল গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সঙ্গে দীর্ঘ বিবাদ ছিল আলোচনায়। আবার ২০১০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয় তাকে সঙ্গ দিয়েছে গত দেড় দশক।

১৯৩৬ সালে আরেকিপায় জন্ম বার্গাসের, মাত্র ১৫ বছর বয়সে সংবাদপত্রে অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর চার বছর পর ৩২ বছর বয়সী দুঃসম্পর্কের খালার সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন, যাকে তার বাবা বলেছিলেন ‘পুরুষোচিত কাজ’।

১৯৬৩ সালে মারিও বার্গাস ইয়োসার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য টাইম অব দ্য হিরো’ প্রকাশিত হয় স্পেনে, যা কি-না পেরুতে সমালোচনার ঝড় তোলে।

লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের অপ্রতিরোধ্য বিস্তারের কেন্দ্রে ছিলেন মারিও বার্গাস ইয়োসা। সঙ্গে ছিলেন হুলিও কোর্তাসার, কার্লোস ফুয়েন্তেস ও গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো সাহিত্যিকরা। ১৯৭১ সালে লেখা ‘গার্সিয়া মার্কেজ: স্টোরি অব দ্য ডিয়াসাইড’ বইটি সাহিত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণের অনন্য এক কীর্তি। অবশ্য এ বন্ধুত্ব বেশিদিন টেকেনি। ১৯৭৬ সালে মেক্সিকো সিটির এক সিনেমা হলে গার্সিয়া মার্কেজ আলিঙ্গন করতে গেলে তিনি ঘুসি মারেন। ২০১৪ সালে মার্কেজের মৃত্যুর তিন বছর পর মাদ্রিদে এক অনুষ্ঠানে ‘মৃত্যুর খবর শুনে আমি দুঃখ পেয়েছিলাম’ বললেও বিরোধের কারণ ব্যাখ্যা করতে অস্বীকৃতি জানান বার্গাস।

তরুণ বয়সে মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী থাকলেও পরবর্তী সময়ে রক্ষণশীল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন বার্গাস। ১৯৮৪ সালে পেরুর প্রেসিডেন্ট তাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৮৭ সালে দেশটির আর্থিক ব্যবস্থা জাতীয়করণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে লিমায় তার ডাকা এক বিক্ষোভে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ জড়ো হয়।

মারিও বার্গাস ইয়োসা ২০১২ সালে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে অংশ নেয়ার পর বুঝতে পেরেছি, আমি রাজনীতিবিদ নই—একজন লেখক। আমি চেয়েছিলাম অ্যাডভেঞ্চারে ভরা জীবন। তবে আমার সবচেয়ে ভালো অ্যাডভেঞ্চারগুলো সাহিত্যেই ঘটেছে।’

২০১০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান এ কিংবদন্তি। পরবর্তীকালে জানান, নোবেল পাওয়ার ফোনকলকে প্রথমে ঠাট্টা ভেবেছিলেন। শুরুতে রূপকথার কথা মনে হলেও পরবর্তী এক বছর ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। এত বেশি সাক্ষাৎকার ও অনুষ্ঠানে যেতে হয়েছিল যে লেখালেখি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে লেখাই ছিল তার শেষ আশ্রয়। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর মারিও বার্গাস ইয়োসার চারটি উপন্যাস প্রকাশ হয়।