বাংলা সিনেমা আজ এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে গল্প-প্রযুক্তির অগ্রগতি, অন্যদিকে সে পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে এক ভয়ংকর পাইরেসি। ঈদে শাকিব খান অভিনীত ‘তাণ্ডব’ মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। এটা সাধারণ হলপ্রিন্ট নয়, এমন লিক দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে নজিরবিহীন! এর আগে গত বছর রোজার ঈদে ‘বরবাদ’ সিনেমাটিরও হয় একই দশা। প্রশ্ন একটাই, এত নিরাপত্তার পরও এ কপি বাইরে যায় কীভাবে? ইন্ডাস্ট্রির ভেতরেই কি কোনো ফাঁক রয়ে গেছে? পাইরেসি শুধু ব্যবসা নষ্ট করে না, শত শত মানুষের স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে এ পাইরেসি ঘটে? ইন্টারনেটের এ যুগে ফাইল ট্রান্সফার প্রটোকল বা এফটিপি সার্ভার একটি অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সাধারণ ইন্টারনেট সংযোগের চেয়ে এফটিপিতে আলাদা ব্যান্ডউইডথ বরাদ্দ থাকে। ফলে বড় ফাইল যেমন সিনেমা, সফটওয়্যার বা গেমস দ্রুত ডাউনলোড বা স্ট্রিম করা যায়। এফটিপি সার্ভার মূলত একটি বিশেষায়িত সিস্টেম, যেখানে ব্যবহারকারীরা সহজেই ফাইল আদান-প্রদান করতে পারে। কিন্তু এ সুবিধার অপব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যক্তি সিনেমা পাইরেসির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

আজকাল কোনো নতুন সিনেমা মুক্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই তা পাইরেটেড সংস্করণে এফটিপি সার্ভারে চলে আসে। শুধু এফটিপিই নয়, ইউটিউব, ফেসবুক বা বিভিন্ন নামি-অনামি ওয়েবসাইটেও অবৈধভাবে সিনেমা আপলোড করা হয়। হিন্দি, তামিল, মালয়ালম, তেলেগু, ইংরেজি কিংবা বাংলা সব ভাষার সিনেমাই পাইরেসির শিকার হচ্ছে। প্রথমে হলের নিম্নমানের রেকর্ডিং (ক্যামরিপ) ছড়ায়, পরে তা উচ্চমানের এইচডি ভার্সনে রূপান্তরিত হয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিনেমা হলে ভিডিও রেকর্ডিং করে বা ওটিটি প্লাটফর্ম থেকে ফাইল লিক করে এ কাজ করা হয়। অনেক সময় হল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এ অপরাধে জড়িত থাকেন, নইলে মূল সিনেমার এইচডি ভার্সন কীভাবে বাইরে চলে আসে? পাইরেসি শুধু ফাইল লিক করাই নয়, বরং তা ডাউনলোড, শেয়ার বা পুনরায় আপলোড করাও একই পর্যায়ের অপরাধ।

পাইরেসি শুধু একটি আইনি অপরাধই নয়, এটি সিনেমা শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি। নির্মাতা, শিল্পী, টেকনিশিয়ান সবাই তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হয়। পাইরেসির কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সিনেমা শিল্প।

সিনেমাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাইরেসির সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে প্রচারণা চালাতে হবে। অন্যথায় একদিন এ শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

চলচ্চিত্র শিল্পের ঘাতক পাইরেসি রোধে নির্মাতা অমিতাভ রেজা বর্ণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাইরেসি একটা গুরুতর সমস্যা। এখন আমাদের করণীয় হলো পাইরেটেড কনটেন্ট না দেখা, না শেয়ার করা। যারা এটা করে, তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি যে পাইরেসির কারণে তাণ্ডব সিনেমার বিশাল একটা ক্ষতি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এগিয়ে যেতে পারবে না।’

পাইরেসি রোধে সাধারণ দর্শকেরও ভূমিকা আছে উল্লেখ করে অমিতাভ রেজা বলেন, ‘পাইরেসি রোধে দর্শকের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তারা যেন পাইরেসি করা সিনেমা না দেখে। টেকনোলজিগত দিক থেকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। যাতে পাইরেসি হওয়া মাত্র দ্রুতই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রযোজনা ও ডিস্ট্রিবিউশন যারা করেন, তাদেরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সরকার থেকেও কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

গত রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া শাকিব খান অভিনীত বরবাদ সিনেমাটিও পাইরেসি হয়েছিল। এ নিয়ে এর প্রযোজক শাহরিন আক্তার সুমি মামলাও করেছিলেন। তবে প্রশাসন থেকে কোনো সাড়া পাননি। শাহরিন আক্তার সুমি আক্ষেপ নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরবাদ পাইরেসি হওয়ার পর আমি মামলা করেছি। প্রশাসন এটা নিয়ে কোনো কাজ করছে না। জিজ্ঞেস করলে বলে মামলার আয়ো হয়নি। আরো নানা কথা। আমার অফিসের নন টেকনিক্যাল যারা আছেন, তারা খুঁজে লিংক দিচ্ছেন কারা পাইরেসি করছে কীভাবে করছে, কিন্তু প্রশাসন এ ব্যাপারে একদম উদাসীন। এখন সিনেমা বানানো আমাদের জন্য একটা ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি প্রশাসনের কাছে বলব, পাইরেসি রোধে সরকারের পক্ষ থেকে স্পেশাল একটা টিম থাকতে হবে। কারণ দিন শেষে সিনেমা আমাদের দেশের একটা সম্পদ। টাকা যারই হোক, কিন্তু সম্পদ দেশের। বলিউডের সঙ্গে বাংলা সিনেমা ট্রেন্ডিংয়ে থাকে, এটা দেশের সিনেমার গর্ব। তাই আমাদের প্রশাসনের উচিত দেশের সম্পদ সিনেমাকে প্রটেক্ট করা।

পরপর দুটি সিনেমা বরবাদ ও তাণ্ডব পাইরেসি হওয়ার পর আগামীতে বড় বাজেটের সিনেমা নিমার্ণ করবেন কিনা জানতে চাইলে সুমি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত জানতে না পারব যে পাইরেসিটা কারা করছে কোথা থেকে হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভয়ের একটা জায়গা থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বড় বাজেটের সিনেমা বানাতে পারব না। বড় সিনেমা বানাতে গেলে আমাকে ভাবতে হবে, সিনেমাটি যদি পাইরেসি হয়ে যায়, তাহলে কী হবে। প্রথম দিন থেকে যদি সিনেমা পাইরেসি হয়, তাহলে আমাদের পুরো ব্যবসাই শেষ। তখন তো আর সিনেমা বানাতে পারব না। তাই পাইরেসি রোধে আমি সরকারকে এগিয়ে আসতে বলব।’

এদিকে গত রোববার পাইরেসি নিয়ে ‘‌তাণ্ডব’ সিনেমার এক বিশেষ প্রদর্শনীতে শাকিব বলেন, ‘‌বাংলা সিনেমা বিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সে জায়গা নষ্ট করে দিতে একটি কুচক্রী মহল উঠেপড়ে লেগেছে। যে সিনেমাটা ভালো চলছে, সেটাকে টার্গেটে নিয়ে পাইরেসি করা হচ্ছে। আমি বলব, এটা শুধু সিনেমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়, এটা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’ সিনেমা বাঁচাতে প্রত্যেকটি মানুষকে সোচ্চার হয়ে পাইরেসির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।’