স্বাধীনতাযুদ্ধের পর থেকেই মঞ্চনাটক দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। গত বছর নানা প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও অসংখ্য নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। মঞ্চনাটক একদিকে সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়েছে, অন্যদিকে চিন্তাশীল নাট্যচর্চার ধারাও বজায় ছিল।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, পেশাদারত্বের অভাব এবং স্পন্সরশিপ সংকটে মঞ্চনাটকে চাপ স্পষ্ট ছিল। তবু থেমে থাকেনি মঞ্চের আলো। নাট্যকর্মীরা বছরের পর বছর ধরে প্রশ্ন, প্রতিবাদ, মানবিক অনুভূতি এবং আত্মানুসন্ধানের গল্প নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়েছেন।

নাটকের মঞ্চে উঠে এসেছে মানুষের ভয়, ক্ষোভ, প্রশ্ন এবং লড়াইয়ের গল্প। যুদ্ধ, দাসত্ব, স্বৈরতন্ত্র, ক্ষমতার কাঠামো, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং নিজের ভেতরের উত্তর খোঁজার বিষয়গুলো বেশির ভাগ নাটকের মূল ভাবনা ছিল।
বছরটি শুরু হয়েছিল আগের বছরের সংকট নিয়ে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের কারণে দীর্ঘ সময় নাট্যচর্চা বন্ধ ছিল। দীর্ঘ সময় মিলনায়তন বন্ধ থাকার পর অক্টোবরের শুরুতেই জাতীয় নাট্যশালায় আবার নাটকের প্রদর্শনী শুরু হয়। এ বাস্তবতায় অনেকেই ধারণা করেছিলেন ২০২৫ সালে মঞ্চনাটকে বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। বাস্তবে সে রকম বড় পরিবর্তন না হলেও মঞ্চ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
গত বছরে ঢাকার দুটি প্রধান মঞ্চ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তিনটি মিলনায়তন এবং মহিলা সমিতির ড. নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে নিয়মিত নাটকের প্রদর্শনী হয়েছে। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পথনাটকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের নাট্যদলগুলো মিলিয়ে গত বছর মঞ্চে এসেছে ৩০টির বেশি নতুন নাটক।

বছরের শুরুতেই কানাডার প্রবাসী বাংলা থিয়েটার দল টরন্টো থিয়েটার ফোকস ঢাকায় মঞ্চস্থ করে"এক জোড়া জুতা। হারানো এক জোড়া জুতাকে কেন্দ্র করে নাটকটি আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার গল্প বলে। ছোট পরিসরের নাটকটি নীরব হলেও শক্ত উপস্থিতি তৈরি করে।
একই সময়ে নবরস নৃত্য ও নাট্যদল মঞ্চে আনে"সাতকাহন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও পরিবেশনাবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীরা মঞ্চে আনেন দ্য রুলস অব লাভ। থিয়েটার আর্ট ইউনিট তাদের ৪০তম প্রযোজনায় মঞ্চস্থ করে"বলয়, যার রচনা ও নির্দেশনা ছিল মোকাদ্দেম মোরশেদের।
আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয় নিয়ে শূন্যন রেপার্টরি থিয়েটার আনে"আত্মজয়। বাঙলা থিয়েটার মঞ্চে এসেছে তুম্বা ও প্রতিবেশী, যেখানে রচনা ও নির্দেশনার পাশাপাশি অভিনয়ও করেছেন মামুনুর রশীদ।
যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে তাড়ুয়া প্রযোজিত অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। এ নাটকে যুদ্ধকে বীরত্বের গল্প হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং দেখানো হয়েছে যুদ্ধ কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বপ্ন ধ্বংস করে দেয়। সৈনিকরা নায়ক নয়, তারা স্বপ্ন হারানো তরুণ। নাটকটি প্রশ্ন তোলে যুদ্ধ আসলে কার জন্য এবং কেন মানুষকেই তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়।
ক্ষমতার আরেক রূপ উঠে এসেছে বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রযোজিত ক্রীতদাস কথা"নাটকে। এখানে দাসত্ব শুধু শারীরিক নয়, বরং ভাবনারও। নাটকটি দেখায় কীভাবে মানুষ ধীরে ধীরে শোষণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। কোনো সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে নাটকটি দর্শককে নিজেই ভাবতে বাধ্য করেছে।
নাট্যদল দৃশ্যপট প্রযোজিত"সক্রেটিসের জবানবন্দি"প্রাচীন গ্রিসের গল্প হলেও বর্তমান সময়ের সঙ্গে সহজেই মিল খুঁজে পায়। অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস দেখানোর কারণে সক্রেটিসকে ভয় দেখানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। নাটকটি মনে করিয়ে দেয় সত্য বলা সহজ নয়, কিন্তু সেটাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ভেতরের সত্য খোঁজার নাটকও এ বছর গুরুত্ব পেয়েছে। নাট্যকেন্দ্র প্রযোজিত ‘তীর্থযাত্রী’ হুমায়ুন কবিরের তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক গ্রন্থের ভিত্তিতে তৌকীর আহমেদের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়। দর্শকের কঠিন প্রশ্নগুলো নাটকটি সহজভাবে তুলে ধরে।

জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি "আগুনি" ছিল বছরের আলোচিত নাটকগুলোর একটি। কাজী নওশাবা আহমেদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও টুগেদার উই ক্যানের যৌথ উদ্যোগে প্রযোজিত নাটকে পাপেট থিয়েটার, গান, নাচ ও অভিনয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে আঘাতপ্রাপ্ত মানুষও আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
চট্টগ্রামের স্কেচ গ্যালারি নন্দনের সাজঘর"হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। নাটকটি শিল্পীজীবনের দ্বন্দ্ব, নিঃসঙ্গতা ও থিয়েটারচর্চার বাস্তবতা তুলে ধরেছে। প্রাচ্যনাট নাট্যদল মঞ্চে আনে ব্যতিক্রম"ও"নিয়ম, যা রাষ্ট্র, আইন ও ন্যায়ের প্রশ্ন সামনে এনে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে। একই দলের প্রযোজনায় খোয়াবনামা ইতিহাস, স্মৃতি ও স্বপ্নের জটিল সম্পর্ক তুলে ধরে।
এছাড়া আরণ্যক নাট্যদলের"কোহে ফেসবুক, থিয়েটার ফ্যাক্টরির কমলা রঙের বোধ, জাগরণী থিয়েটারের কাদা মাটি, অনুস্বর নাট্যদলের বুদ্ধিজীবীর ঘরে শয়তান, অবলোকনের গন্ধসূত্র, পদাতিক নাট্য সংসদের আলিবাবা এবং চল্লিশ চোর, দৃশ্যকাব্যের ইডিপাস, ঢাকা থিয়েটারের"রঙমহাল মঞ্চে এসেছে।
বছরজুড়ে জুলাই পুনর্জাগরণ নাট্যোৎসব, ‘মুনির চৌধুরী জাতীয় নাট্যোৎসব’ এবং ‘জাতীয় পথ নাট্যোৎসব’ মঞ্চকে সক্রিয় রেখেছে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের মঞ্চনাটক ছিল প্রশ্নমুখর। কিছুটা হতাশা থাকলেও মঞ্চ নিরাশ করেনি দর্শককে।










