দীর্ঘদিন ধরে বিলেতে অবস্থান করছেন নাট্যকর্মী ও নির্মাতা লীসা গাজী। বিদেশে থিয়েটারে কাজ করলেও বাংলাদেশের গল্প নিয়েই তার ভাবনা থাকে। লিসার নির্মিত সিনেমা ‘বাড়ির নাম শাহানা’ দর্শকমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সিনেমাটি ৯৮তম একাডেমি পুরস্কারে সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার চলচ্চিত্র বিভাগে নারী পরিচালিত বাংলাদেশের প্রথম অফিশিয়াল চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছে। সম্প্রতি তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ অবলম্বনে নতুন সিনেমা নির্মাণ করতে যাচ্ছেন। এ সিনেমা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে লীসা গাজী কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান
বিলেতে থাকা সত্ত্বেও দেশে সিনেমা বানানোর ভাবনা কেন এল?
আমি বিলেতে থিয়েটারে কাজ করি। ২০০৮ সাল থেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত আছি। বিলেতে বসবাস করলেও আমার কাজ দেশ ও দেশের মানুষকে ঘিরেই।
আমাদের প্রথম নাটক ‘বীরাঙ্গনা: উইমেন অব ওয়ার’ নির্মাণ হয়েছিল বীরাঙ্গনা নারীদের জীবনকে কেন্দ্র করে। নাটকটি বিলেতের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়। পরে সেটির অনুবাদ করে বাংলাদেশেও মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করি। নাটকটি যখন বিলেতে প্রদর্শন হচ্ছিল, তখন একজন সিনেমা প্রযোজক তা দেখতে আসেন। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, নাটকের বাইরে আমার আর কোনো ভাবনা আছে কিনা। তখন আমি বলি, বীরাঙ্গনা নারীদের হার না মানা গল্প যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য একটি তথ্যচিত্র নির্মাণে কাজ করতে চাই। কারণ তাদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের কাছে নেই, পরিকল্পিতভাবেই যা নষ্ট করা হয়। তিনি জানান, আমি যদি সিনেমাটির নির্দেশনা দিই, তাহলে তিনি প্রযোজক হবেন। মূলত এভাবেই আমার সিনেমা নির্মাণে আসা।
আমি বিলেতে বসবাস করলেও আমার কাজের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ। সেসব গল্প আমাকে টানে যা লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে যায়, অবহেলিত হয়; যেখানে একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে ওঠে তার স্বপ্ন, কাজ ও চিন্তায়। নিজের গড়া পথে যারা দৃপ্ত পায়ে হাঁটে।
বাড়ির নাম শাহানা সিনেমাটি নির্মাণের সময় কোন অভিজ্ঞতাগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল?
বাড়ির নাম শাহানা নির্মাণের সময় অনেক মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা ছোট একটি শহর কুমারখালীতে সিনেমাটির দৃশ্যায়ন করেছি। কুমারখালীর মানুষ আমাদের আপন করে নিয়েছিল। তারা আমাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। তাদের এ আন্তরিকতা আমাদের কাজকে আনন্দময় আর সহজ করে দিয়েছিল।
ওই সিনেমার অভিজ্ঞতা শাস্তি নির্মাণে কতটা প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?
বাড়ির নাম শাহানা নির্মাণের অভিজ্ঞতা অবশ্যই শাস্তি নির্মাণে বড় প্রভাব ফেলবে। সিনেমাটি আমাকে নির্মাণের জন্য প্রস্তুত করেছে। এটি মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের যে সাড়া পেয়েছি, সেটিও শাস্তি নির্মাণে আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাস্তি গল্পের কোন দিকটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে?
শাস্তি গল্পটি আমি প্রথম পড়ি, যখন আমার ১২ কিংবা ১৩ বছর বয়স। এরপর বহুবার পড়েছি। আমার পড়া ছোটগল্পগুলোর মধ্যে শাস্তি আমার অন্যতম প্রিয়।
যে সময়ে আমরা বাস করছি, সে সময়কে আমি বোঝার চেষ্টা করছি। সেই তাড়না আর অস্থিরতা থেকেই উঠে এসেছে শাস্তির গল্প। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একই নামের ছোট গল্প থেকে যার অঙ্কুরোদগম ঘটেছে। এ গল্পের বাস বৈসাদৃশ্যে সময়সীমার পরিক্রমায়, বাস্তব ও ভার্চুয়াল জীবনের উপলব্ধি ও সত্যের গরমিলে; যা দেখা যায়, আবার লুকিয়েও রাখা হয়, তার মধ্যে। এটি সত্য, ন্যায়বিচার ও মানুষের নিঃশব্দ লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। ছবিটি সময়ের সঙ্গে যেমন বোঝাপড়ার, তেমনি আশার সন্ধান করে ফেরারও বটে।
২০১৪ সালে নির্মিত শাস্তি সিনেমার সঙ্গে আপনার কাজের মৌলিক পার্থক্য কোথায় বলে মনে করেন?
২০১৪ সালের শাস্তি সিনেমাটি আমার দেখা হয়নি। আমি বহু বছর দেশ ছাড়া, সে কারণে অনেক সিনেমাই দেখা হয়ে ওঠে না। তবে জানি, সে সময়"শাস্তি" ছবিটি নির্মাণ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের মূল গল্পের ওপর ভিত্তি করেই।
আমরা যে শাস্তি নির্মাণ করতে যাচ্ছি, সেটি রবীন্দ্রনাথের গল্প থেকে উৎসারিত ও অনুপ্রাণিত হলেও তা বর্তমান সময়ের গল্প বলবে।
চঞ্চল চৌধুরী ও পরীমণিকে শাস্তি সিনেমায় কাস্টিংয়ের কারণ কী?
পরীমণি যে চরিত্র অভিনয় করবেন, সেখানে তাকে ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারিনি। চরিত্রটির জন্য আমার কাছে পরীমণিকেই প্রয়োজন।
একই ভাবে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়ের যে বহুমাত্রিকতা, সেটার ওপর ভর করেই তার চরিত্রটি আমি ভেবেছি। এ সিনেমার জন্য দুজনকেই আমার বিশেষভাবে দরকার। তারা কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন, সে চমক আপাতত তুলে রাখছি।
সিনেমা নিয়ে সামনের পরিকল্পনা কী?
সামনে কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে নিচ্ছি। একটি ড্রামা সিরিজ নিয়ে কাজ করছি, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়েও পরিকল্পনা আছে।










