কেউ কেউ প্যারাসাইটকে দশকের সেরা ছবি বলতেও পিছপা হচ্ছেন না। এমন ঘটনা কোনো দক্ষিণ কোরীয় ছবির জন্য এই প্রথম। গত বছর কান উৎসবে আলোড়ন তুলে পালমে দ’র জিতে নেয় ছবিটি। আয়ের দিক থেকেও এটি সফলতা দেখাচ্ছে। এই মুহূর্তে ছবিটি দক্ষিণ কোরিয়ার তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ছবিতে পরিণত হয়েছে। ৯২তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে প্যারাসাইট ছয়টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে, এর মধ্যে আছে সেরা পরিচালক, সেরা ছবির বিভাগও। এমন কৃতিত্ব কোনো কোরীয় ছবির জন্য প্রথম। ৭৭তম গোল্ডেন গ্লোবে সেরা বিদেশী ছবির পুরস্কারও গেছে বং জুন-হো পরিচালিত প্যারাসাইট-এর ঘরে।

প্যারাসাইট ছবির নির্মাতা হিসেবে এক বছর সময় ধরে দুনিয়ার নানা প্রান্তে আলোচিত হচ্ছেন পরিচালক বং জুন-হো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এত সম্মান-সাফল্য এর আগে কোনো কোরীয় পরিচালক পাননি। যুক্তরাষ্ট্রে বংকে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন টকশোতে ডাকা হচ্ছে। তিনি ও তার ছবি এখন পর্যন্ত ১৭০টি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে এবং সংখ্যাটা এখনো বাড়ছে।

৫০ বছর বয়সী বংকে নিয়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় হ্যাশট্যাগ #বংহাইভ চালু হয়েছে। বংয়ের সঙ্গে সবসময় থাকেন তার দোভাষী শ্যারন চোই। শ্যারনও এখন ছোটখাটো তারকা হয়ে গেছেন। বং ইংরেজি বোঝেন কিন্তু বলেন খুব কম। কথা বলার সময় তিনি কোরীয় ভাষা ব্যবহার করেন, শ্যারনই সেটা অন্যদের অনুবাদ করে শোনান।

বিপুল সাফল্য পাওয়ার পরও বং জুন-হোর পা এখনো মাটিতে। অস্কারকে তিনি এখনো খুব বড় কিছু মনে করেন না, বরং আরো অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কারের একটিই বিবেচনা করেন।

অতি সম্প্রতি লন্ডনে বংয়ের সঙ্গে আলাপ করেছেন দ্য গার্ডিয়ান-এর স্টিভ রোজ। ব্রিটিশ সিনেমার প্রতি বংয়ের বিশেষ আগ্রহ আছে। হিচককের সাইকো তিনি ৫০ বারের বেশি দেখেছেন।

প্যারাসাইট-এ দেখা যায় সমাজের দুই ভিন্ন অর্থনৈতিক স্তরে থাকা পরিবারগুলোর গল্প। বং বলেন, ‘ওপর থেকে দেখলে কোরিয়াকে অনেক ধনী ও গ্ল্যামারাস দেশ মনে হয়—কে-পপ, উচ্চগতির ইন্টারনেট, আইটি। কিন্তু ধনী ও গরিবের মধ্যে ব্যবধান এখানে ক্রমেই বাড়ছে। তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।’

স্টিভ রোজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে লন্ডনের গৃহহীন মানুষের তাঁবু দেখিয়ে বং বলেন, সিউলেও অনেক মানুষ এভাবে থাকেন। বংয়ের কথায় এরা সমাজের অন্ধ বিন্দুগুলোয় থাকেন, যেখানে মানুষের নজর পড়ে না।

বং জানান, প্যারাসাইট নিছক ধনী-গরিবের বৈষম্যের গল্প নয়। কেউই শতভাগ সাধু কিংবা দোষী নন। বং প্যারাসাইটকে ‘নিরপেক্ষ’ ছবি বলে মনে করেন। তিনি নির্দেশ করে বলেন প্যারাসাইট-এ মি. মার্কের চরিত্রটি তার কাছে মার্ক জাকারবার্গের মতো, যে সততা ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে ধনী হয়েছে। ‘তিনি লোভী মানুষ নন। তিনি অবৈধ কাজ করে ধনী হননি।’ একই সময়ে প্যারাসাইট-এ এটাও দেখা যায় পার্ক পরিবার গরিবদের ঘৃণা করে, তাদের মতে গরিবদের শরীরে দুর্গন্ধ থাকে।

অন্যদিকে প্যারাসাইট-এর কিম পরিবার কঠোর পরিশ্রমী হলেও গরিব। পরিবারের সদস্যরা একতাবদ্ধ। বং তাদের সম্পর্কে বলেন, ‘এমন না যে কিমরা কোনো দোষ করেছে কিংবা তারা অলস। সমস্যাটা হলো তারা উপযুক্ত কাজ পায় না। বং এ সময় উল্লেখ করেন প্যারাসাইট ছবির একটি দৃশ্য আছে, যেখানে কলেজ পাস করা ৫০০ তরুণ নিরাপত্তা রক্ষীর একটি পদের জন্য আবেদন করছেন। ‘দৃশ্যটি মোটেও বাড়িয়ে দেখানো নয়। এ রকম একটি ঘটনার প্রতিবেদন আমি পড়েছিলাম।’

বলা যায়, প্যারাসাইট সমাজের শ্রেণী ব্যবস্থার সমালোচনার চেয়ে বরং পুরো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। শোষণ কি অনিবার্য? কোনো উন্নত বিকল্প কি আছে? ‘প্যারাসাইট ছবি দেখিয়েছে পরস্পরের প্রতি মানুষকে যে ন্যূনতম সম্মান দেখানো উচিত, তা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে।’

প্যারাসাইট দেখে অনেকে বলেছেন, এটা একটি সর্বজনীন গল্প, কারণ এতে ধনী-গরিবের বৈষম্য দেখানো হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় না

পুরো উত্তরটা এত সরল। আমার মনে হয়, ছবিটি সাফল্য পেয়েছে এর সিনেম্যাটিক আবেদনের জন্য।

প্যারাসাইট কেবল দুর্দান্ত গল্প নয়, একই সঙ্গে গল্পটি বলা হয়েছে অসাধারণ দক্ষতায়। গল্প, অভিনয়, পরিচালনা—সব মিলেই সফল হয়েছে এটি। সমালোচকরা বলেছেন ছবির দৃশ্যের গল্প বলার মুনশিয়ানার কথা। ছবিতে কোনো সাবটাইটেল না থাকলেও চলে।

প্যারাসাইটকে চলচ্চিত্রের প্রথাগত কোনো বিভাগে ফেলা মুশকিল। ছবিটি অনেক বিভাগেই উপযুক্ত মনে হতে পারে—ফ্যামিলি ড্রামা, ব্ল্যাক কমেডি, শ্রেণী সমাজের প্রহসন, এমনকি ডমেস্টিক হরর। ছবিতে বং জুন-হোর ওপর হিচককের প্রভাব স্পষ্ট হয়। কিন্তু সব প্রভাব এড়িয়ে আবার বং নিজেকে স্বতন্ত্র হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছেন।

 

ভাষান্তর: শানজিদ অর্ণব