বলিউডের অন্যতম ক্ল্যাসিক নির্মাতা মুকুল আনন্দ। কিন্তু অকাল মৃত্যু ও অন্য আরো কিছু কারণে তিনি আলোচনার বাইরে চলে গেছেন। তবে তিনি যে সময়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন সে সময়ই সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। প্রযুক্তির ছোঁয়া রেখে কাজ করতে পারলে তিনি আরো দারুণ সিনেমা উপহার দিতে পারতেন। ১৯৯৭ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে তার অকাল মৃত্যু ঘটে। তার হাতে তখনো অনেক গল্প, অনেক আইডিয়া। সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট ‘দস’ নির্মাণের সময়ই মারা যান মুকুল।

মুকুল আনন্দ সিনেমার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তার কাকা ইন্দ্র রাজ আনন্দ ছিলেন রাজ কাপুরের ১৯৪৮ সালের কালজয়ী ছবি ‘আগ’-এর চিত্রনাট্যকার। পরে ইন্দ্রর ছেলে ও মুকুলের চাচাতো ভাই টিনু আনন্দ নিজেও হয়ে ওঠেন অভিনেতা ও পরিচালক। তিনি পরিচালনা করেন অমিতাভ বচ্চনের ‘কালিয়া’ (১৯৮১), ‘শাহেনশাহ’ (১৯৮৮) এবং ‘মেজর সাহাব’ (১৯৯৮)-এর মতো সিনেমা।

মুকুলের বাবা ছিলেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কর পরামর্শদাতা। তার ক্লায়েন্টদের তালিকায় ছিলেন বলিউডের সেরা তারকারা। কিন্তু বাবার অসুস্থতার পর পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয় মুকুলকে। যদিও তার ইচ্ছা ছিল চলচ্চিত্রে আসার, কিন্তু পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে তাকে তা সাময়িকভাবে ত্যাগ করতে হয়। তিনি তখন বানাতে শুরু করেন হাতে তৈরি ল্যাম্পশেড, যেগুলো তিনি মুম্বাইয়ের বান্দ্রার লিংকিং রোডে ট্রাফিক সিগন্যালে বিক্রি করতেন মাত্র ২৫ রুপিতে।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘স্কুল শেষ করে বুঝলাম আমি সিনেমায় আসতে চাই। কিন্তু পরিবার তখন খারাপ অবস্থায়, তাই আমি একজন ‘‘স্ট্রাগলার’’ হতে পারতাম না।’

8

শেষ পর্যন্ত তিনি সিনেমায় প্রবেশ করেন সহকারী পরিচালক হিসেবে। চেতন আনন্দ, বিজয় আনন্দ ও রবি ট্যান্ডনের মতো কিংবদন্তি পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেন। পরে তিনি গোপনে কিছু গুজরাটি ও পাঞ্জাবি সিনেমাও পরিচালনা করেন। তার প্রথম সিনেমা ছিল ১৯৮৩ সালের গুজরাটি সিনেমা ‘কাক্কু কি কিমত’।

মুকুল ১৯৮৪ সালে হিন্দি সিনেমা ‘কানুন কেয়া কারগো’ দিয়ে অভিষেক করেন। সিনেমাটি ছিল জে লি থম্পসনের ১৯৬২ সালের থ্রিলার ‘কেপ ফিয়ার’-এর অনানুষ্ঠানিক রিমেক। এরপর করেন ‘অ্যায়তবার’ (১৯৮৫), যা ছিল আলফ্রেড হিচককের ‘ডায়াল এম ফর মার্ডার’ (১৯৫৪)-এর রিমেক।

তবে তিনি নিজের মৌলিক পরিচিতি পান ১৯৮৬ সালের ঐতিহাসিক মহাকাব্য ‘সালতানাত’ দিয়ে। তবে মুকুল ও অমিতাভ বচ্চনের যুগলবন্দি হিট সিনেমা দিয়েছিল। তিনি অমিতাভকে নিয়ে নির্মাণ করেন অগ্নিপথ (১৯৯০), হাম (১৯৯১) ও খোদা গাওয়া (১৯৯২)। অগ্নিপথ তখন বক্স অফিসে হিট না করলেও পরে তা কাল্ট ক্ল্যাসিকে পরিণত হয়। হামের একাধিক গান জনপ্রিয়। সিনেমাটিতে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন রজনীকান্ত ও গোবিন্দ।

wew

বড় পরিসরে সিনেমা বানাতে পছন্দ করতেন মুকুল। ‘ট্রিমূর্তি’তে (১৯৯৫) নিয়েছিলেন জ্যাকি শ্রফ, অনীল কাপুর ও শাহরুখ খানকে। সিনেমাটি ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর তিনি সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট ‘দস’ নিয়ে কাজ শুরু করেন। এটি ছিল ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব নিয়ে নির্মিত একটি রাজনৈতিক থ্রিলার। এতে অভিনয় করছিলেন সালমান খান, সঞ্জয় দত্ত, শিল্পা শেঠি, রাভিনা ট্যান্ডন ও রাহুল দেব।

কাশ্মীরে শুটিংয়ের অনুমতি না পেয়ে তিনি আমেরিকার উটাহতে বিশাল সেট তৈরি করেন এবং সেখানেই ছবির ক্লাইম্যাক্স অংশ শুট করেন। মজার ব্যাপার, তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন ক্রিকেটার ইমরান খানকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন এবং ইমরান রাজি হয়েছিলেন। যদিও তিনি পরে অভিনয় করেননি। ২০১৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

কিন্তু উটাহতে শুটিং চলাকালীন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুকুল আনন্দ মারা যান। তার প্রযোজক অংশীদার নিতিন মনমোহন পরবর্তী সময়ে এ সিনেমা শেষ করার চেষ্টা করেন। রমেশ সিপ্পি ও ডেভিড ধাওয়ানের মতো পরিচালকদের কাছে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু কেউই মুকুলের ভিশন অনুযায়ী সেই গ্র্যান্ড ফিনালে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ফলে দস আজও মুক্তি পায়নি।

তবে তার প্রভাব আজও আছে। দস সিনেমার জন্য তিনি শঙ্কর-এহসান-লয়কে প্রথম একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেন। তাদের তৈরি করা গান ‘সুনো গওর সে দুনিয়া ওয়ালো’ রাতারাতি হিট হয়ে যায়। সুখবিন্দ্র সিং এ সিনেমার জন্য ‘মাহিয়া’ শিরোনামে গান গেয়েছিলেন। মুকুল আনন্দের ভাতিজা সিদ্ধার্থ আনন্দ আজ তার পথ অনুসরণ করে বলিউডে বড় বাজেটের হিট সিনেমা নির্মাণ করছেন। তার হাত ধরেই এসেছে ‘ওয়ার’ (২০১৯) ও ‘পাঠান’ (২০২৩)। মুকুলের প্রভাব বলিউডের সিনেমায় এখনো দেখা যায়।

দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান