এ সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান। বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দর্শক পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। ‘মহানগর’ ও ‘তাকদীর’-এর মতো আলোচিত ধারাবাহিকে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন এ অভিনেতা। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত সিনেমা ‘বলী’। এ সিনেমা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান

আপনার অভিনীত বলী সিনেমাটি এ মাসের শুরুতে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। এ সিনেমার দর্শক সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

সিনেমাটি দর্শক একেবারে হামলে পড়ে দেখছে, তা নয়। কিন্তু যারা দেখছে, তারা যেমন রেসপন্স করছে, সেটা বেশ পজিটিভ। এ সিনেমার গল্পে অনেক কিছুই দুর্বোধ্য লেগেছে বলে দর্শকের কাছে শুনেছি। দুর্বোধ্যতার কারণে তাদের মধ্যে নানা ধরনের কৌতূহলও জেগেছে। ফলে তারা অনেক প্রশ্ন করছে। এটাও আমার কাছে পজিটিভ লেগেছে।

এ সিনেমায় বলীখেলাটা আপনার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

আমি তো আর বলী নই। আমাকে বলী হয়ে উঠতে হয়েছে। বলীটা এমনভাবে হয়ে উঠতে হবে, যাতে দর্শকের কাছে তাকে একজন বলী বলেই মনে হয়। অবশ্যই এটা একটা চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জটুকু আমার পরিচালক ও টিম দেখাশোনা করেছে। তারা কুতুবদিয়া থেকে হায়ার করে দুজন অরজিনাল বলী নিয়ে এসেছিলেন। তারা আমাদের অতি যত্ন সহকারে ধৈর্য ধরে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

বলীতে অভিনয়ের জন্য কতটা প্রস্তুত ছিলেন?

একটা গল্পে কাজ করার জন্য যখন প্রস্তাব আসে, তখন এটা নিয়ে কাজ করা হলে আস্তে আস্তে প্রস্তুতিটা শুরু হয়ে যায়। আমাদের বলীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। কীভাবে বলীরা ধরে, হাতের পজিশন কী থাকে, পায়ের পজিশন কেমন হয়, কী কী প্যাঁচ আছে বলির মধ্যে, এগুলো প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে।

এ সিনেমার পরিচালক ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা যদি বলতেন।

ইকবাল ভাই পারফরমারদের প্রত্যেক বিষয় খুব ভালো করে দেখাশোনা করেন, যত্ন নেন। যখন কোনো পারফরমার ক্যামেরার সামনে কাজ করেন, তাদের উচিত নিজেকে শতভাগ পরিচালকের ওপর সঁপে দেয়া। তাহলে পরিচালক তার মতো করে পারফরমারদের গড়ে নিতে পারেন। সে হিসেবে তিনিও এমনই একজন পরিচালক। পারফরমারদের নিজের মতো গড়তে পেরেছেন। ইকবাল ভাইয়ের কাছে আমি সে আস্থার জায়গাটা পেয়েছি। পারফরমাররা যেন ক্যারেক্টারে সহজে ঢুকতে পারি, সেজন্য সব ধরনের সহযোগিতা তার কাছ থেকে পেয়েছি।

আপনি অনেক পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন, সেসব পরিচালকের সঙ্গে এ সিনেমার পরিচালকের ভিন্নতা কী?

ভিন্নতা বলতে যদি বলি দেখতাম শুটিং চলছে, পরবর্তী সিন নেয়ার আগে তাকে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। পরে দেখা যেত, তিনি কোনো এক জায়গায় একা শুয়ে আছেন। হয়তো বিচের কোনো গাছতলায়।

এমনটা কেন করতেন?

তিনি হয়তো পরবর্তী সিন নিয়ে ভাবতেন। কীভাবে ক্যারেক্টারকে ফুটিয়ে তোলা যাবে, তা নিয়ে চিন্তা করতেন। হয়তো এটা তার আলাদা একটা পদ্ধতি।

বলী নিয়ে দর্শকের উদ্দেশে কী বলবেন?

দর্শকের উদ্দেশে বলতে চাই, আমাদের দর্শক বহু আগে থেকেই প্রস্তুত আছে। তারা নানা ধরনের সিনেমা দেখে এখন অভ্যস্ত। বর্তমান সময়ে তারা বিভিন্ন বিদেশী মুভি সিরিজ দেখে থাকে। আমি দর্শককে বলব, এখন যে ভিন্ন ধরনের গল্প হচ্ছে তার টেস্টটা নেন, আশা করি ভালো লাগবে।

সিনেমাটি বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে। এটি বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি ও আপনার ক্যারিয়ারের কতটুকু অর্জন বলে মনে করছেন?

আমার ক্যারিয়ারের জন্য কতটা ভালো হয়েছে জানি না। ওটা নিয়ে আমি ভাবিও না। পুরস্কারটা আমি ব্যাক্তিগতভাবে পাইনি, পুরো টিম পেয়েছে। অর্থাৎ বলী সে উৎসবের শ্রেষ্ঠ সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে। তখন নিজের জন্য যতটা না ভালো লেগেছে বা আনন্দ হয়েছে, তার থেকে বেশি আনন্দ লেগেছে এই ভেবে যে আমার দেশের ও চাটগাঁ অঞ্চলের একটা সিনেমা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটা উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে। এটা অবশ্যই আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য অনেক বড় একটি অর্জন। নিশ্চয় এ অর্জনগুলো আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প তথা শিল্প সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেবে।

একটা সময় অর্থের অভাবে ভুগছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে লাইমলাইটে চলে এসেছেন। আপনার সফলতা নিয়ে পেছনের গল্পটা যদি শেয়ার করতেন।

প্রতিটা মানুষেরই একটা স্ট্রাগলিং পিরিয়ড থাকে। মানুষের কর্ম মানুষকে একটা জায়গায় নিয়ে যায়। এটা আমি বিশ্বাস করি। পুরনো প্রবাদে ফিরে যেতে হচ্ছে—‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’। যদি আপনি ভালো কিছু দিতে পারেন, তাহলে নিশ্চয়ই ভালো ফিডব্যাক পাবেন।

আপনি মঞ্চে অভিনয় করেছেন। একজন ভালো অভিনেতা হতে গেলে মঞ্চে অভিনয় করা কতটা জরুরি, আপনার অভিনয়ের ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা অনুসারে যদি বলতেন।

মঞ্চ অবশ্যই একজন অভিনেতাকে তিলে তিলে গড়ে তোলে। তার শরীর-মন গঠনে সহায়তা করে। তাকে নিয়মানুবর্তিতা শেখায়, দায়িত্বশীল হতে শেখায়, তার দৃষ্টিশক্তি প্রসার করে, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, বিনয়ী হতে শেখায়, সর্বোপরি তাকে একটা শান্ত টলটলে অনুভূতির দিঘির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এ দিঘিতে স্নান করে একজন অভিনেতা দর্শকের সামনে হাজির হয়। তবে আমি মনে করি, ভালো অভিনেতা হতে গেলে মঞ্চে কাজ করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।

বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ আপনি কেমন দেখেন?

বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ আমার কাছে সত্যিকার অর্থে খুবই ভালো বলে মনে হয়। গত কয়েক বছর যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখতে পাই, বর্তমানে আমাদের দেশে চলচ্চিত্র জগতের প্রতিটি শাখায় প্রচুর মেধাবীরা নতুন নতুন গল্প ও নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। নিশ্চয়ই আগামীতেও বাংলা সিনেমার জন্য আরো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।