দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আজ যেন দীর্ঘশ্বাসে মোড়া এক নিস্তব্ধ সময় পার করছে। নাটক, সিনেমা, গান কিংবা মঞ্চনাটক—সব জায়গায় যেন নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। যে শিল্পজগৎ একসময় প্রাণচঞ্চল ও সৃজনশীলতায় ভরপুর ছিল, আজ তা অনেকটাই স্থবির ও নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। এসব মাধ্যমের মাঝেই যেন থেমে আছে সময়। করোনাভাইরাস মহামারীর তীব্র প্রভাব, আর্থিক সংকট, অনিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনার অভাবে শিল্পজগতের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একেকটি মঞ্চ, একেকটি স্টুডিও কিংবা শুটিং ফ্লোর আজ নীরবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এ নীরবতা কবে কাটবে? সংস্কৃতির এ দীর্ঘ নিস্তব্ধতায় আবারো কবে ফিরে আসবে প্রাণ?
সেট আর ফ্লোরে আজ নীরবতা
একসময় বহুল ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত এফডিসি এখন যেন পরিত্যক্ত কোনো স্টুডিওর মতো নীরব ও শূন্য। কোথাও নেই ‘টেক ওকে’ বলে ওঠা কণ্ঠস্বর, নেই শুটিংয়ের হাসি-আড্ডা ও কাজের ধুমধাম। বেতন না পেয়ে কর্মচারীরা আন্দোলনে, আর শুটিং? গুনে গুনে দিনেও একটা হচ্ছে কিনা সন্দেহ। নতুন সিনেমার খবরও খুব একটা নেই। ঈদের সিনেমা ‘আলী’ মুক্তি পেলেও নীরবে হারিয়ে গেছে। দর্শক হলে একবার ফিরলেও এখন তাদের আগ্রহ কমে গেছে, যা শিল্পের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
নাটকেও নেই প্রাণ, নেই উচ্ছ্বাস
আগে ঈদ মানেই নাটকের উৎসব। একেকটি চ্যানেল নাটক নিয়ে যুদ্ধ করত। কিন্তু এবার কোরবানির ঈদে মাত্র ১২৪টি নাটক প্রচার হয়েছে, তারও বেশির ভাগ পুরনো। নতুন নাটকের সংখ্যা কমার পেছনে স্পন্সরের অভাব, দর্শকের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং অনলাইন ভিউ কম হওয়া অন্যতম কারণ। নির্মাতারা জানাচ্ছেন, ‘খরচ ওঠে না, কাজ হচ্ছে না’। এমন অবস্থায় শিল্পের গতি পুরোপুরি থমকে দিয়েছে। মঞ্চে পড়ে আছে ধুলা, মিলনায়তনে নেই কোলাহল।
শিল্পকলার মঞ্চেও যেন ক্লান্তি নেমে এসেছে। মাঝে মাঝে কিছু নাটক মঞ্চস্থ হয়, তবে তা অধিকাংশ সময়ই সরকারি অনুদানে। নাট্যদল নতুন প্রযোজনা আনতে উৎসাহী নয়। অভিভাবকহীন নেতৃত্ব, নাট্যকার সংকট, হল বরাদ্দের জটিলতা—সব মিলিয়ে থেমে গেছে মঞ্চনাটকেরও গতিপথ। এসব কারণে বহু প্রতিভাবান নাট্যকার ও অভিনেতাও এখন মঞ্চ থেকে দূরে সরে আসছেন।
তারকাদের ছুটির সময়
শিল্পীরা শুধু পর্দায় নয়, বাস্তবেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন। জোভান বিশ্রামে, হিমি কানাডায়, কেয়া দেশে ফিরেও শুটিংয়ে ফিরে আসেননি। নিলয় যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন, শাকিব-বুবলী আগেই সেখানে অবস্থান করছেন। ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে কাস্টিং লিস্ট, জনপ্রিয় তারকারাও হারিয়ে যাচ্ছে অচেনা আড়ালে। শিল্পীদের এ অবস্থা শিল্পাঙ্গনের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।
নতুন দিশার সন্ধানে
তবে কি আলো আর ফিরবে না? অপূর্ব, নিশো, চঞ্চল, মেহজাবীন—যারা একসময় পর্দার প্রাণ ছিলেন, আজ তাদের দেখা মেলাই যেন কষ্টসাধ্য। অনেকের হাতে কাজ নেই, নির্মাতারা দিন গুনছেন, কখন শুরু হবে সেই ব্যস্ত দিনগুলো। তবুও কিছু নাট্যদল চেষ্টা করছে নতুন নাটক মঞ্চে আনার, আবার কেউ ডিজিটাল মাধ্যমে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর পথ খুঁজছেন। এ অনিশ্চিত সময়ে শিল্পীরা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পরিবর্তিত মাধ্যমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রয়াস চালাচ্ছেন।
ফিরে আসার প্রত্যাশায়
শিল্পাঙ্গন আবার জীবন্ত হবে। মঞ্চ-ফ্লোরে ফিরে আসবে প্রাণ, হয়তো শিগগিরই আমরা আবার দেখব অভিনয়শিল্পীদের পদচারণা।










