মঞ্চ হচ্ছে অভিনয়ের প্রাণ। যেখান থেকে তৈরি হয় গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী। মঞ্চকে অভিনয়ের স্তম্ভও বলা যেতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে দিন দিন যেন এর আবেদন কমে আসছে। কভিডের কারণে অনেকদিন বন্ধ থাকলেও পরে দেশের নাট্যাঙ্গন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। একের পর এক নাটক এসেছে মঞ্চে। দর্শকও ভিড় জমিয়েছে নাট্যশালায়। কিন্তু সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না। বিভিন্ন দল থেকে নাট্যকর্মী কমে যাওয়া থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাবসহ আরো নানা সমস্যা জেঁকে বসেছে মঞ্চে।

সম্মানীর কমতির কারণে অনেকেই মঞ্চ বা নাটকের দল ছাড়েন। এর মধ্যে আবার চলছে বিভাজন। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! পরস্পর দোষারোপ আর কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত একে অন্যের বিরুদ্ধে। সংস্কৃতি রক্ষার ধারক ও বাহক হচ্ছে শিল্পকলা একাডেমি। সে প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের কর্মকাণ্ড নিয়েও হয়েছে আলোচনা ও সমালোচনা। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। এরপর ঘটেছে বেশকিছু ঘটনা যা জটিলতা সৃষ্টি করেছে।

কিছুদিন আগে মাসুম রেজার লেখা ও পরিচালনায় ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকটি মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিলেন। এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। এদিকে সর্বশেষ শিল্পকলার মঞ্চে অভিনয় থেকে নাট্যজন মামুনুর রশীদকে সাময়িক মঞ্চনাটক থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিল্পকলার ডিজি সাহেব ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন, আমি যাতে শিল্পকলায় অভিনয় না করি। নাটকের ২০০তম প্রদর্শনী হয়েছে। এখন আমাকে বলা হচ্ছে এ নাটকে যেন অভিনয় না করি। কারণ হিসেবে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সময় দেয়া ২৪ জন বিশিষ্ট জনের একটি বিবৃতির কথা জানিয়েছেন। আমি কিন্তু সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমিতে ‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকে অভিনয় করছি, মহিলা সমিতির মঞ্চেও অভিনয় করেছি, তাতেও কোন সমস্যা হয়নি। শিল্পকলা একাডেমির অসুবিধার জায়গাটা কোথায়? অবশ্যই অসুবিধার একটা জায়গা আছে, কারণ ‘‌‘নিত্যপুরাণ’’ তারা বন্ধ করেছে, পরে এর প্রতিবাদ সভায় আমার ওপর হামলা করেছে। পরদিন আমাদের শো ছিল, কিন্তু তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম। তখন থেকেই এ কথাগুলোর সূচনা হলো, আমি যদি অভিনয় করি, তাহলে মামলা হবে।’

সৈয়দ জামিল আহমেদও তার কথার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মামুনুর রশীদকে শিল্পকলায় অভিনয় করা থেকে বিরত থাকা প্রসঙ্গে জামিল আহমেদ বলেন, ‘আমি মামুনুর রশীদকে নিজে ফোন করে তাদের নাটকের শো করতে বলেছিলাম। নাটকটি করা দরকার। এ নাটকে উনি ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন, তাকে অনুরোধ করেছি সে চরিত্র যদি অন্য কাউকে দিয়ে করানো যায়। কারণ আপনি যেহেতু আন্দোলনের সময় রাজাকার নিয়ে কিছু বলেছিলেন, এটা নিয়ে মানুষের খুব কষ্ট আছে। আপনি গেলে মানুষের সে কষ্টটা বাড়বে। সেজন্য আপনি ছাড়া যদি নাটকটির প্রদর্শন সম্ভব হয়, এটা আপনি দেখেন।’

মঞ্চে অভিনয় না করার এমন অনুরোধের প্রতিক্রিয়ায় মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমার কোনো অপরাধ নেই, অথচ আমাকে অভিনয় করতে দেবে না। রাজাকার স্লোগান নিয়ে ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেখানে আমার নাম ছিল। ওই বিবৃতিতে কী অপরাধ আছে? এখন তো বলা হচ্ছে আপনারা কথা বলেন, সে কথাই বলতে পারব না, এমন একটা সময় চলে এসেছে। একটা মহল তো চাচ্ছেই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি যেন বন্ধ হয়ে যাক। আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি ‘‘‌রাঢ়াঙ’’ আমরা করব না। ‘‘‌কোম্পানি’’ও করব না। চলুক যতদিন এ ব্যবস্থা চলে।’

এ ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। তিনি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘‌মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি একটি স্লোগানের বিরোধিতা করেছেন। তিনি শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প নিয়ে বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে তিনি জুলাই গণ-আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় ফুলবাড়ী সুন্দরবন আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেছেন। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে নাট্যকার অভিনেতা সংগঠক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের নাট্যজগতের খুবই শক্তিশালী এক ব্যক্তিত্ব।’

নিত্যপুরাণ নাটকের রচয়িতা ও নির্দেশক মাসুম রেজা লিখেছেন, ‘গত ২ নভেম্বর দেশ নাটকের ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, তা শিল্পকলার ডিজি তার দুই-একজন সহকর্মীকে নিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বলেছিলেন, ‘‘ছোট্ট যুদ্ধে হেরেছি, কিন্তু বড় যুদ্ধে হারব না,’’ বড় যুদ্ধটা কার সঙ্গে?’

এ অবস্থায় অনেকে মনে করছেন, সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম মাধ্যম মঞ্চ ভালো নেই। সমস্যা তৈরি হলেও তা সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে না বলেই তারা মনে করেন। এমনিতেই সংস্কৃতি চর্চার এ মাধ্যম জটিলতা পার করছিল, তার ওপর আবার এত দ্বন্দ্ব, ভেদাভেদ। সবারই ভাবনা, চলমান অস্থিরতা কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে মঞ্চনাটককে? প্রশ্ন উঠছে, কোনদিকে যাচ্ছে দেশের নাট্যাঙ্গণের ভবিষ্যৎ?